
বাংলা সংগীতজগতের ক্ষণজন্মা তারকা হ্যাপী আখান্দ—যার নাম শুনলেই ভেসে ওঠে একটি গানের সুর, ‘আবার এল যে সন্ধ্যা’। মাত্র ২৭ বছর বয়সে বিদায় নিলেও তাঁর সুর আজও বেঁচে আছে প্রজন্মের কণ্ঠে। আজ তাঁর ৬৫তম জন্মদিনে স্মরণ করা হলো সেই অনন্য সংগীত প্রতিভাকে।
১৯৮৭ সালের শীতের এক নিঃশব্দ সন্ধ্যায় থেমে যায় এক সুরের জীবন। হ্যাপী আখান্দের মৃত্যু যেন বাংলা সংগীতে এক দীর্ঘশ্বাস রেখে যায়।
‘আবার এল যে সন্ধ্যা’ শুধু একটি গান নয়—এটি এক অনুভূতির নাম, যা সময়ের সীমানা পেরিয়ে আজও হৃদয়ে বাজে।
জিমি হেনড্রিক্স, কার্ট কোবেইন বা অ্যামি ওয়াইনহাউসের মতো হ্যাপীকেও ধরা হয় ‘ক্লাব টোয়েন্টি সেভেন’–এর সদস্য হিসেবে—যারা ২৭ বছর বয়সেই পৃথিবীকে চিরদিনের মতো ছেড়ে গেছেন।
১৯৬০ সালের ১২ অক্টোবর পুরান ঢাকার পাতলা খান লেনে জন্ম হ্যাপীর। তাঁর আসল নাম জিয়া হাসান আখান্দ। বড় ভাই লাকী আখান্দ ছিলেন তাঁর সংগীতগুরু, বন্ধু ও প্রেরণা। ছোটবেলায় লাকী তাঁর হাতে এক পয়সা গুঁজে দিয়েছিলেন, যা যেন সুরের উত্তরাধিকার হস্তান্তরের প্রতীক হয়ে রইল।
হ্যাপীর শৈশব কেটেছে গানের ভেতর। মাত্র ৮ বছর বয়সেই গানের হাতেখড়ি। ১৯৬৮ সালে লাকীর সঙ্গে নিজস্ব গিটার তৈরি করে শুরু হয় তাঁদের সংগীতযাত্রা। পরবর্তীতে মান্না দে ও রাহুল দেব বর্মনের মতো গুণী শিল্পীরাও প্রশংসা করেছিলেন হ্যাপীর কণ্ঠ ও সুরের প্রতিভা।
জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘মাইলস’–এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন হ্যাপী আখান্দ। ব্যান্ডের সদস্য শাফিন আহমেদ তাঁকে স্মরণ করে বলেন,
“হ্যাপীর হাতে যে যন্ত্রই তুলে দিতাম, সে সেটাতে সুর বের করে ফেলত। গানে তাঁর মিউজিক সেন্স ছিল অবিশ্বাস্য।”
হ্যাপীর জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে—
‘কে বাঁশি বাজায় রে’, ‘নীল নীল শাড়ি পরে’, ‘আমি আবার আসব ফিরে’, ‘সবাই যখন ঘুমে’ প্রভৃতি।
১৯৭৩ সালে ভাই লাকীর সঙ্গে ব্যান্ড গঠন করেন, যা পরবর্তীতে হয় ‘হ্যাপী টাচ’।
মৃত্যুর পর ১৯৯৩ সালে লাকী আখান্দ প্রকাশ করেন হ্যাপীর একমাত্র একক অ্যালবাম ‘শেষ উপহার’।
অ্যালবামের প্রচ্ছদে লেখা ছিল—
“বন্ধুরা আমার গান গেয়ো, আমাকে বাঁচিয়ে রেখো।” — জিয়া হাসান আখান্দ হ্যাপী
১৯৮৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর হঠাৎ মৃত্যুর খবরে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরো সংগীতজগৎ।
আইয়ুব বাচ্চু একবার বলেছিলেন—
“বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতে প্রথম বড় ধাক্কা ছিল হ্যাপীর চলে যাওয়া। সেই শূন্যতা আজও পূরণ হয়নি।”
আজও ফিডব্যাক, মাইলস, কিংবা তরুণ শিল্পীদের কণ্ঠে বাজে হ্যাপীর গান।
যখনই ‘আবার এল যে সন্ধ্যা’ বাজে, মনে হয়—
পাতলা খান লেনের সেই তরুণ গিটার হাতে আবার ফিরে এসেছেন।
হ্যাপী আখান্দ হয়তো চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর গান, সুর আর কণ্ঠ এখনো প্রতিদিন নতুন করে জন্ম নেয়।
তিনি জ্বলে উঠেছিলেন — নিভে যাননি কখনো।