
এক মাস ধরে মেট্রোরেলের একটি স্থায়ী কার্ড কেনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন ঢাকার দক্ষিণখানের বাসিন্দা হেলেনা জাহিদ। একাধিকবার উত্তরা উত্তর স্টেশনে গিয়েও ব্যর্থ হয়ে অবশেষে হাল ছেড়ে দিয়েছেন তিনি।
প্রায়ই গোপীবাগে যেতে হয় হেলেনার। তিনি বলেন, “উত্তরা থেকে মেট্রোরেলে খুব সহজে মতিঝিল নেমে গোপীবাগে যাওয়া যায়। কিন্তু স্থায়ী কার্ড না থাকায় এখন একক যাত্রার কার্ড দিয়েই যেতে হয়। প্রতিবার লাইনে দাঁড়াতে হয়, এতে সময়ও বেশি লাগে, খরচও বাড়ে।”
ঢাকায় হেলেনার মতো নিয়মিত যাতায়াতকারীদের অনেকেই এখন এই সমস্যায় ভুগছেন। স্থায়ী কার্ডের সংকট কাটছে না, যদিও মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে—সংকট নিরসনে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে মেট্রোরেলের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ট্রেন চলাচল করছে, কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের কাজও চলছে। এখন প্রতিদিন গড়ে চার লাখ যাত্রী মেট্রোরেল ব্যবহার করছেন।
মেট্রোরেলের স্থায়ী কার্ড দুই ধরনের—এমআরটি পাস (ডিএমটিসিএল মালিকানাধীন) ও র্যাপিড পাস (ডিটিসিএ মালিকানাধীন)। উভয় প্রতিষ্ঠান সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন হলেও, স্থায়ী কার্ডের নিয়ন্ত্রণ কোন সংস্থার হাতে থাকবে তা নিয়ে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে টানাপোড়েন চলছে।
এই প্রশাসনিক দ্বন্দ্বের কারণে নতুন এমআরটি পাস কেনা বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে ডিটিসিএ যে পরিমাণ র্যাপিড পাস সরবরাহ করছে, তা দিয়ে ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ সম্ভব হচ্ছে না—ফলে যাত্রীদের ভোগান্তি বেড়েছে।
লাইন–৬ প্রকল্পের অধীনে শুরুতে ৭ লাখ ২৩ হাজার এমআরটি কার্ড এবং ৩ লাখ ১৯ হাজার একক যাত্রার কার্ড কিনেছিল ডিএমটিসিএল। পরবর্তীতে আরও ৪ লাখ ৪০ হাজার একক যাত্রার কার্ড কেনা হয়। বর্তমানে আড়াই লাখের মতো একক কার্ড মজুত আছে, কিন্তু স্থায়ী কার্ড ফুরিয়ে গেছে।
ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ জানিয়েছেন,
“ডিটিসিএ ৫০ হাজার র্যাপিড পাস দিয়েছে, আরও দেবে। পাশাপাশি এক লাখ এমআরটি কার্ড কেনার জন্য শিগগিরই দরপত্র আহ্বান করা হবে।”
ডিটিসিএর এক কর্মকর্তা জানান, সর্বশেষ ৭ অক্টোবর আড়াই লাখ কার্ড সরবরাহের কথা ছিল, কিন্তু পাওয়া গেছে মাত্র এক লাখ। এর মধ্যে ৫০ হাজার কার্ড মেট্রোরেলের স্টেশনগুলোতে দেওয়া হয়েছে, যা এক মাসের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ডিএমটিসিএল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডিটিসিএ থেকে গোপন কোড পাওয়ার পর এখন তারা নিজেরাই এমআরটি পাস কিনতে পারবে। তবে দরপত্র প্রক্রিয়ায় নতুন কার্ড পেতে তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগতে পারে।
স্থায়ী কার্ড সংকটের পাশাপাশি যাদের পুরোনো এমআরটি কার্ড নষ্ট বা হারিয়ে গেছে, তাদের জন্যও সমস্যা ছিল। কারণ, কার্ডের অব্যবহৃত টাকা জমা থাকত ডিটিসিএর ক্লিয়ারিং হাউসে, যার গোপন কোড ছিল কেবল তাদের হাতে। ফলে হারানো বা নষ্ট কার্ডের টাকা উদ্ধার করা যাচ্ছিল না।
ফার্মগেট থেকে সচিবালয় পর্যন্ত নিয়মিত যাতায়াতকারী আসিফ আহমেদ বলেন, “আমার পুরোনো এমআরটি কার্ডে ৪০০ টাকা ছিল, কার্ড হারানোর পর সেই টাকা ফেরত পাইনি।”
তবে সম্প্রতি ডিটিসিএ সেই গোপন কোড মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষকে দিয়েছে। এখন পুরোনো বা নষ্ট এমআরটি কার্ডের অব্যবহৃত টাকা র্যাপিড পাসে স্থানান্তর করা সম্ভব হচ্ছে।
ফারুক আহমেদ বলেন,
“পুরোনো বা নষ্ট এমআরটি কার্ডের অব্যবহৃত টাকা এখন নতুন র্যাপিড পাসে যোগ করা যাচ্ছে। এতে যাত্রীদের একাংশের বিপত্তি কেটেছে।”
সংক্ষেপে:
মেট্রোরেলের স্থায়ী কার্ড সংকট এখনও কাটেনি। প্রশাসনিক জটিলতা ও সরবরাহ ঘাটতির কারণে নতুন কার্ড পাওয়া যাচ্ছে না, যদিও কর্তৃপক্ষ বলছে—দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে শিগগিরই সমস্যা সমাধান করা হবে। ততদিন পর্যন্ত হেলেনা জাহিদের মতো হাজারো নিয়মিত যাত্রীকে একক কার্ডেই ভরসা রাখতে হবে।