
ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে সংগীতের আকাশে আলো ছড়িয়ে চলেছেন রুনা লায়লা। উর্দু, হিন্দি ও বাংলা—তিন ভাষাতেই সমান পারদর্শী এই কিংবদন্তি শিল্পী আজও কোটি শ্রোতার হৃদয়ে জায়গা করে আছেন। তবে তাঁর এই সাফল্যের যাত্রা ছিল না একেবারে সহজ; পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফিরে এসে পড়তে হয়েছিল নানা বাধা, ঈর্ষা আর বয়কটের মুখে। তবু গানই ছিল তাঁর আশ্রয়, অবলম্বন ও শক্তি।
রুনা লায়লার শৈশব কেটেছে পাকিস্তানের করাচিতে। সংগীতে আগ্রহের আগেই শুরু হয়েছিল নাচের প্রশিক্ষণ। মা আমিনা লায়লার উৎসাহে বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টসে ভর্তি হন তিনি। সেখানে চার বছর শিখেছেন কত্থক ও ভরতনাট্যম।
তবে ভাগ্য তাঁকে টেনে নেয় গানের দিকে। বড় বোন দিনা লায়লার সঙ্গে গানের তালিম নিতে নিতে অজান্তেই নিজেও হয়ে ওঠেন গায়িকা। একদিন ওস্তাদ আবদুল কাদের তাঁর গাওয়া গান শুনে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন—“এই মেয়েটি একদিন অনেক দূর যাবে।” ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয়, রুনা হয়ে ওঠেন উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী।
১৯৬৪ সালের ২৪ জুন করাচির ইস্টার্ন স্টুডিওতে রুনা লায়লার প্রথম গান রেকর্ড হয়। পরের বছর ‘জুগনু’ ছবিতে মুক্তি পায় তাঁর কণ্ঠের গান ‘গুড়িয়া সি মুন্নি মেরি’। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১২ বছর। সুরকার মাসরুর আনোয়ার ও সফদার হুসেনের মতো বরেণ্যদের সঙ্গে কাজ করে দ্রুতই জায়গা করে নেন সংগীতের জগতে।
ষাট ও সত্তরের দশকে পাকিস্তানে তাঁর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়, এমনকি ছড়িয়ে পড়ে ভারতেও। নূরজাহানের পর যার নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হতো, তিনি রুনা লায়লা।
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি রুনা লায়লা বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তখনই শুরু হয় নতুন অধ্যায়—যেখানে সাফল্যের পাশাপাশি আসে ঈর্ষা ও বয়কট। সহশিল্পীদের অনেকেই তাঁর সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করতে চাননি। কিন্তু শ্রোতাদের ভালোবাসা তাঁকে আগলে রেখেছে সবসময়।
রুনা বলেন, “বয়কট টেকেনি, কারণ শ্রোতার ভালোবাসা আমার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল।”
প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রুনা লায়লা বলেন,
“আমি কখনো ভেঙে পড়িনি। ওপরওয়ালার ওপর বিশ্বাস ছিল। ভেবেছি, যদি আমার মধ্যে ট্যালেন্ট থাকে, সব বাধা পার হব। পরিবারের ভালোবাসা আর মানুষের শ্রদ্ধাই আমাকে শক্তি দিয়েছে।”
তিনি আরও বলেন,
“জীবনে অনেক বাধা এসেছে, কিন্তু আমাকে কখনো কারও কাছে গিয়ে কাজ চাইতে হয়নি। আল্লাহর রহমতে কাজ আমার কাছেই এসেছে।”
সংগীতজগতে নানা রাজনীতি, সমালোচনা আর নেগেটিভিটি—সব কিছুর মোকাবিলা করেছেন গান দিয়েই।
“আমি কাউকে বদদোয়া দিইনি। যারা আমার বিপক্ষে গেছে, তাদের সম্পর্কেও ভালোই বলেছি। গানই আমার সাধনা, গানই আমার প্রার্থনা,”
বলেন রুনা লায়লা।
সংগীতজীবনের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে মাছরাঙা টেলিভিশন আয়োজন করেছে স্টার নাইট–এর বিশেষ পর্ব। আজ রাত ৯টায় প্রচারিত হবে অনুষ্ঠানটি। উপস্থাপনায় রয়েছেন মৌসুমী মৌ, প্রযোজনায় অজয় পোদ্দার। এতে থাকবে রুনা লায়লার জীবনের গল্প, স্মৃতি ও উপমহাদেশের শিল্পীদের শুভেচ্ছা বার্তা।
বাংলা, হিন্দি, উর্দু ছাড়াও ১৭টি ভাষায় গান গেয়েছেন রুনা লায়লা—যার মধ্যে আছে পাঞ্জাবি, সিন্ধি, গুজরাটি, আরবি, পারসি, মালয়, ইতালিয়ান, স্প্যানিশ ও ফ্রেঞ্চ।
নিসার বাজমির সুরে টানা তিন দিনে ৩০টি গান রেকর্ড করে গিনেস বুকে নাম তুলেছেন তিনি।
১৯৮২ সালে বাপ্পি লাহিড়ীর সুরে সুপার রুনা অ্যালবাম প্রকাশিত হয়—প্রথম দিনেই যার বিক্রি হয়েছিল এক লাখ কপি।
ছয় দশক পেরিয়েও রুনা লায়লার কণ্ঠে আছে প্রথম দিনের দীপ্তি। তাঁর গানে প্রেম, বেদনা, আনন্দ—সবকিছুরই প্রকাশ।
রুনা লায়লার ভাষায়—
“যত দিন গাইতে পারব, তত দিন বাঁচব।”