
সুন্দরবনসংলগ্ন খুলনার কয়রা উপজেলার গোবরা গ্রামের বনজীবী জাহিদুল ইসলাম গত তিন দশক ধরে বন ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাঁর চোখে পড়েছে এক উদ্বেগজনক পরিবর্তন—যেখানে একসময় সুন্দরীগাছের ঘন জঙ্গল ছিল, এখন সেখানে ফাঁকা স্থান। বহু সুন্দরীগাছ শুকিয়ে মারা গেছে।
এই পরিবর্তনের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে এক নীরব ঘাতক—পরগাছা। এটি ধীরে ধীরে সুন্দরবনের প্রাণ, সুন্দরীগাছকে মেরে ফেলছে।
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘সুন্দরবনের বয়স্ক সুন্দরীগাছে তিন ধরনের পরগাছা গাছগুলোকে মেরে ফেলছে।’ তিনি উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের পরামর্শ চেয়েছেন এ সমস্যা মোকাবিলায়।
বনজীবী ও কর্মকর্তাদের মতে, আগে শাখা-প্রশাখায় সীমাবদ্ধ থাকা পরগাছা এখন মূল অংশ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। গাছ দুর্বল হয়ে একসময় মারা যাচ্ছে।
প্রথম আলোর এক প্রতিবেদক শিবসা নদীসংলগ্ন কালাবগী এলাকায় গিয়ে দেখেন, একের পর এক রোগাক্রান্ত গাছ। কোনোটি শুকিয়ে মরা, কোনোটি আগা মরায় কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। অনেক সুন্দরীগাছের গায়ে ধূসর-বিবর্ণ বা সবুজ পরগাছা দেখা গেছে, যেন শেওলার আস্তরণে ঢেকে গেছে গোটা গাছ।
স্থানীয় বনজীবীরা বলছেন, আগে এত পরগাছা চোখে পড়ত না। বিশেষ করে বয়স্ক ও সুন্দরী প্রজাতির গাছই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত।
ডিএফও রেজাউল করিম জানান, সুন্দরীগাছে আগামরা রোগ আগে থেকেই ছিল। এখন পরগাছা বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। সুন্দরবনের প্রায় ২৫–৩০ শতাংশ সুন্দরীগাছ বর্তমানে পরগাছায় আক্রান্ত। অনেক গাছ ইতিমধ্যে মারা গেছে।
তিনি বলেন, “এই পরগাছা এখন সুন্দরবনের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ। দ্রুত গবেষণা শুরু করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।”
বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের মমিনুল ইসলাম জানান, পরগাছা নিয়ে এখনো বিস্তারিত গবেষণা হয়নি। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়াসিউল ইসলাম জানান, আক্রান্ত গাছের ছবিতে দুটি উদ্ভিদ দেখা যায়—একটি হলো ‘মিসলটো’, যা গাছের পুষ্টি শোষণ করে তাকে দুর্বল করে তোলে; অন্যটি একধরনের ফার্ন, যা পরাশ্রয়ী হলেও পুষ্টি নেয় না।
অধ্যাপক ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, “যেখানে লবণাক্ততা বেশি বা জোয়ার-ভাটার প্রবাহ কম, সেখানে সুন্দরীগাছ দুর্বল হয়। দুর্বল গাছেই পরগাছা সহজে ছড়িয়ে পড়ে।”
করমজল বন্য প্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের কর্মকর্তা আজাদ কবির বলেন, ফারাক্কা বাঁধের পর সুন্দরবনে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় গাছ পানি ওপরে তুলতে পারছে না, ফলে গাছ ছোট ও দুর্বল হয়ে পড়ছে। এতে পরগাছা দ্রুত ছড়াচ্ছে। তাঁর মতে, “সমস্যার মূল কারণ পরগাছা নয়, বরং লবণাক্ততা।”
উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সদস্যসচিব মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, উজান থেকে পশুর ও বলেশ্বর নদ দিয়ে মিষ্টি পানির প্রবাহ বাড়ানোই একমাত্র কার্যকর সমাধান। এখনই ব্যবস্থা না নিলে সুন্দরীগাছের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে।
ভারতের গবেষকেরা সতর্ক করেছেন—সুন্দরবনে দূষণ ও অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট জিন বাড়ছে, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য নতুন হুমকি। কলকাতার আইআইএসইআর-এর অধ্যাপক পুণ্যশ্লোক ভাদুড়ীর মতে, দুই দেশের বিজ্ঞানীদের যৌথ গবেষণাই এই সংকট মোকাবিলার পথ খুলে দিতে পারে।
সুন্দরীগাছ শুধু একটি গাছ নয়—সুন্দরবনের প্রাণ, উপকূলের রক্ষাকবচ। পরগাছা, লবণাক্ততা ও দূষণের কারণে এর অস্তিত্ব বিপন্ন হচ্ছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হারাতে পারে তার পরিচয় ও প্রাণশক্তি—সুন্দরীকে।