
গত জুনে বগুড়ার শেরপুর উপজেলা পরিষদের সামনে তিন চাকার একটি যানচাপায় আহত হন ব্যবসায়ী বিলু চৌধুরী। রাজধানীর একটি হাসপাতালে ১৫ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তাঁর মৃত্যু হয়। স্থানীয়দের মতে, দুর্ঘটনাপ্রবণ ওই স্থানটি ঢাকা–বগুড়া মহাসড়কের অংশ, যেখানে প্রায় নিয়মিতই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
শেরপুর উপজেলার উত্তরে দশমাইল থেকে দক্ষিণে সীমাবাড়ি পর্যন্ত প্রায় ২১ কিলোমিটার মহাসড়ক দুর্ঘটনাপ্রবণ হিসেবে পরিচিত। সরেজমিনে দেখা গেছে, এই সড়কে দ্রুতগতির যানবাহন চলাচল করে, কিন্তু নিরাপদে রাস্তা পারাপারের কোনো ব্যবস্থা নেই। উপজেলা পরিষদ, মহিলা কলেজসহ একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সড়কের পাশে অবস্থিত। সিএনজিচালিত ও পায়ে চালিত রিকশার যত্রতত্র চলাচল পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করেছে।
শেরপুর পৌর শহরের ক্রীড়া সংগঠক আবদুল খালেক বলেন, “প্রতিদিন জীবন হাতে নিয়ে আমাদের এই সড়ক ব্যবহার করতে হয়।”
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, দেশের ২১টি স্থান সড়ক দুর্ঘটনার ‘অতি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা’। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের ৩৭ হাজার দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব জায়গায়ই সংঘটিত হয়েছে মোট দুর্ঘটনার ১৪ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে সড়ক নির্মাণে জোর দেওয়া হলেও সড়ক ব্যবস্থাপনায় তেমন মনোযোগ নেই। ফলে উন্নত সড়কেও নছিমন, ভটভটি ও অবৈধ তিন চাকার যানবাহন চলাচল করে, যা দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহনবিশেষজ্ঞ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, “দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান নির্ধারণ খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এই মানচিত্রায়ণ দুর্ঘটনার কারণ ও প্রবণতা কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে সরকার কীভাবে এটি বাস্তবায়ন করবে, সেটিই এখন মুখ্য প্রশ্ন।”
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, ২০২০–২০২৪ সালে দেশে মোট ৩৭ হাজার দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩১৪টি স্থানে। এর মধ্যে—
২১টি অতি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা
১৩৯টি অতি দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা
১৭৫টি সাধারণ দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা
অতি উচ্চ ঝুঁকির এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে: ঢাকা ও ধামরাই, গাজীপুরের সদর উপজেলা, কালিয়াকৈর ও শ্রীপুর, টাঙ্গাইলের কালিহাতী, মাদারীপুরের শিবচর ও টেকেরহাট, ফরিদপুরের ভাঙ্গা, পাবনার ঈশ্বরদী, বগুড়ার শেরপুর, নাটোরের বড়াইগ্রাম, চট্টগ্রামের মিরসরাই, পটিয়া ও সীতাকুণ্ড, কক্সবাজারের চকরিয়া, চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা, বরিশালের গৌরনদী, হবিগঞ্জের মাধবপুর এবং ময়মনসিংহের ত্রিশাল ও ভালুকা।
এই এলাকাগুলোতেই গত পাঁচ বছরে ৪ হাজার ৬৩৯ জন নিহত হয়েছেন।
চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার বড় দারোগারহাট থেকে ধুমঘাট সেতু পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার অংশে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। গত এক বছরে ৮২টি দুর্ঘটনায় ৪২ জন নিহত হয়েছেন।
জোরারগঞ্জ হাইওয়ে থানার ওসি আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, “ঢাকা ও উত্তরবঙ্গ থেকে আসা চালকেরা ভোরবেলা ক্লান্ত অবস্থায় মিরসরাই অতিক্রম করেন। ঘুমভাব ও অতিরিক্ত গতি দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।”
এ ছাড়া অবৈধ তিন চাকার যানবাহন, এলোমেলো রাস্তা পারাপার, রাস্তার পাশে বাজার ও বর্ষায় সড়কের খানাখন্দও দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
বড় সড়কে ছোট বা অবৈধ তিন চাকার যান চলাচল
নতুন সড়কে নিরাপত্তা অবকাঠামোর অভাব
রাস্তার পাশে হাট-বাজার, বাস কাউন্টার ও যাত্রী ওঠানামা
চালকদের প্রশিক্ষণ ও বিশ্রামের অভাব
দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৬৪ লাখ, তবে অতিরিক্ত ৭০ লাখ অবৈধ তিন চাকার ছোট যানবাহনও রাস্তায় চলছে।
বিআরটিএর পরিচালক (রোড সেফটি) সীতাংশু শেখর বিশ্বাস বলেন, “ছোট যানগুলোকে এখন বাস্তবতায় ধরতে হবে। তাদের প্রশিক্ষণ বাড়াতে নতুন কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।”
অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেনের মতে, “উন্নত প্রকৌশলে তৈরি সড়কে অনুন্নত যান চলাচলই বড় বিপর্যয়। সড়ক আছে, কিন্তু এর পরিচালনা নেই।”