
বঙ্গোপসাগরের বুকে অবস্থিত প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে দেখা মিলেছে বিরল এক প্রজাতির কাঁটাযুক্ত পটকা মাছের (Diodon holocanthus)। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এই মাছের উপস্থিতি প্রমাণ করে দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া জোরদার হচ্ছে।
ঘটনাটি ঘটে গত ১৭ অক্টোবর সেন্ট মার্টিনের দক্ষিণের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ছেঁড়াদিয়ার পশ্চিম সৈকতে। সেদিন জোয়ারের সময় সৈকতে আটকে পড়ে মাছটি। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক মো. কামরুল হাসান তখন দ্বীপে অবস্থান করছিলেন। তিনি দ্রুত কাছে গিয়ে বুঝতে পারেন এটি বিরল এক প্রজাতির কাঁটাযুক্ত পটকা মাছ।
কামরুল হাসান জানান, “এই মাছের উপস্থিতি প্রমাণ করে সেন্ট মার্টিনে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো ইতিবাচক ফল দিচ্ছে। এখন দ্বীপে কাঁকড়া, কাছিমসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর সংখ্যা বাড়ছে।”
সরকার জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তিন বছর মেয়াদি ‘সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের আওতায় সৈকতে কেয়াবাগান তৈরি, পরিবেশ সচেতনতা বাড়াতে বিলবোর্ড স্থাপন, কাছিমের ডিম পাড়ার স্থান চিহ্নিতকরণ, এবং প্রশিক্ষণ ও গবেষণার কাজ চলছে।
১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর কামরুল হাসানের নেতৃত্বে পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি দল পুরো দ্বীপ ঘুরে দেখেন এবং ছেঁড়াদিয়া, গোলদিয়া ও দিয়ারমাথা এলাকায় পর্যবেক্ষণ চালান।
কামরুল হাসান বলেন, “দ্বীপের বিভিন্ন স্থানে পরিযায়ী পাখি, লাল কাঁকড়া ও শামুক-ঝিনুকের বংশবিস্তার লক্ষ্য করেছি। তবে ছেঁড়াদিয়ায় দেখা পাওয়া কাঁটাযুক্ত সুন্দর পটকা মাছটি ছিল সবচেয়ে বিস্ময়কর। এই মাছ সাধারণত প্রবালপ্রাচীর ও পাথুরে রিফ এলাকায় বসবাস করে।”
এই প্রজাতির মাছ শক্ত খোলসযুক্ত প্রাণী যেমন শামুক, কাঁকড়া ও ছোট মেরুদণ্ডী প্রাণী শিকার করে খায়। বড় কোনো শত্রুর সামনে পড়লে এটি পানি বা বাতাস গিলে শরীরকে বেলুনের মতো ফুলিয়ে নেয়, ফলে তীক্ষ্ণ কাঁটাগুলো বাইরের দিকে বেরিয়ে আসে—এভাবেই এটি আত্মরক্ষা করে।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, এই মাছের বৈজ্ঞানিক নাম ডায়োডন হলোকানথাস (Diodon holocanthus), যা সাধারণত লং-স্পাইন পোর্কুপাইন ফিশ নামে পরিচিত। গায়ের রং হালকা বাদামি, তাতে ছোট ছোট কালো বিন্দু থাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিন্দুগুলোর সংখ্যা কমে যায়। পূর্ণবয়স্ক মাছ প্রায় ৫০ সেন্টিমিটার লম্বা হয় এবং উষ্ণমণ্ডলীয় সমুদ্র এলাকায় এদের বসবাস।
সেন্ট মার্টিন ইউনিয়নের ইউপি সদস্য নাজির হোসেন জানান, “ছেঁড়াদিয়ায় এই জাতের পটকা মাছের উপস্থিতি বেড়েছে। এটি সাধারণত প্রবালপ্রাচীরের ভেতরেই থাকে এবং ছোট মাছ ও শামুক খেয়ে বাঁচে।”
স্থানীয় জেলে জমির হোসেন, যিনি ২৩ বছর ধরে দ্বীপে মাছ ধরছেন, বলেন, “সেন্ট মার্টিনের সাগরে তিন প্রজাতির পটকা মাছ ধরা পড়ে। এর মধ্যে কাঁটাযুক্ত পটকা খুবই বিরল ও দেখতে আলাদা। তবে বিষাক্ত হওয়ায় কেউ এই মাছ খায় না।”
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সেন্ট মার্টিনে এখন ১,০৭৬ প্রজাতির প্রাণী রয়েছে—এর মধ্যে রয়েছে প্রবাল, শৈবাল, কাছিম, কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক, সামুদ্রিক মাছ ও বিভিন্ন পাখি। পর্যটন নিয়ন্ত্রণ, প্লাস্টিক ব্যবহার হ্রাস ও দূষণ কমাতে নেওয়া পদক্ষেপের ফলে দ্বীপের প্রকৃতি ধীরে ধীরে ভারসাম্যে ফিরছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদেরা।