
নিউক্লিয়ারবিজ্ঞানী আর্নেস্ট জে মনিজ, যিনি ওবামার সময় যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সেক্রেটারি ছিলেন এবং বর্তমানে নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভ–এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বলেছেন—‘আ হাউস অব ডিনামাইট’ সিনেমাটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে আবার বৈশ্বিক উদ্বেগ বেড়েছে।
তিনি ভ্যারাইটি ম্যাগাজিনে লিখেছেন, “‘আ হাউস অব ডিনামাইট’ মুক্তি পেয়েছে এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বের পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা ৪০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো আবার বাড়ছে। প্রায় ১২ হাজার পারমাণবিক অস্ত্রের এই পৃথিবীতে এক ভুল সিদ্ধান্তই বৈশ্বিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।”
অস্কারজয়ী পরিচালক ক্যাথরিন বিগেলো নির্মিত এই সিনেমাটি মাত্র ১৮ মিনিটের সময়সীমায় এক ভয়ংকর সংকটকে তুলে ধরে। প্রশান্ত মহাসাগর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ছুটে আসছে একটি আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (ICBM)—কে পাঠিয়েছে, কেউ জানে না। হাতে সময় মাত্র ১৮ মিনিট।
সিনেমাটি এই সময়টিকে তিনটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখায়—সেনাবাহিনী, হোয়াইট হাউস এবং প্রেসিডেন্টের দৃষ্টিতে। প্রেসিডেন্টের সামনে দুটি সিদ্ধান্ত—
১. ক্ষেপণাস্ত্রটিকে পড়তে দেওয়া, যাতে লাখো মানুষ মারা যাবে।
২. না জেনেই পাল্টা পারমাণবিক আক্রমণ চালানো—যার মানে হতে পারে আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ।
বিগেলো দেখিয়েছেন, মানবসভ্যতা যেন এক বারুদের ঘরে বাস করছে—একটি ভুল বোতামেই পৃথিবী ধ্বংস হতে পারে।
সিনেমায় প্রেসিডেন্ট, সেনা কর্মকর্তা, কূটনীতিক—সবার মধ্যেই দ্বিধা। কেউ বলছে আঘাত করতে, কেউ বলছে অপেক্ষা করতে। প্রেসিডেন্ট নিজেও স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে পরামর্শ চাইছেন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মেয়ে শিকাগোতে, যেখানে ক্ষেপণাস্ত্র পড়তে পারে—এ তথ্য গল্পে এক মানবিক স্পর্শ যোগ করেছে।
নেটফ্লিক্সে মুক্তির পর প্রথম তিন দিনেই ছবিটি দেখা হয়েছে ২ কোটি ২১ লাখ বার। তবে পেন্টাগন সিনেমার কিছু দৃশ্য নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। তাদের দাবি—
সিনেমায় দেখানো মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা “ব্যর্থ” হয়, কিন্তু বাস্তবে তাদের সাফল্যের হার প্রায় ১০০ শতাংশ।
চিত্রনাট্যকার নোয়াহ ওপেনহেইম অবশ্য বলেন, “আমরা বাস্তবতাই তুলে ধরেছি, কারণ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিখুঁত নয়।”
নির্মাতারা পেন্টাগন, সিআইএ ও হোয়াইট হাউসের সাবেক কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন।
অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল ড্যান কার্বলার, যিনি স্পেস অ্যান্ড মিসাইল ডিফেন্স কমান্ড–এর প্রধান ছিলেন, ছবির প্রযুক্তিগত উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন।
সিনেমাটি এমন সময় এসেছে, যখন ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তি—যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি—নবায়ন নিয়ে আলোচনা চলছে।
চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি, তাই এই সিনেমা নতুন করে বৈশ্বিক নিরাপত্তা আলোচনায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড জে মার্কি বলেছেন,
“দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আমাদের রক্ষা করতে পারবে না। প্রকৃত সমাধান হলো বিশ্বজুড়ে অস্ত্রভান্ডার কমানো।”
তিনি আরও লেখেন,
“প্রতিরক্ষা যত বাড়ে, ততই প্রতিপক্ষ নতুন অস্ত্র তৈরি করে। এই প্রতিযোগিতাই বিপদ ডেকে আনে।”
‘আ হাউস অব ডিনামাইট’ কেবল একটি সিনেমা নয়, এটি মানবজাতির জন্য এক সতর্কবার্তা—
অস্ত্র যত বাড়বে, নিরাপত্তা তত কমবে।
আর পৃথিবী, হয়তো একদিন সত্যিই হয়ে উঠবে একটি ডিনামাইটের ঘর।