
চলতি বছরের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ৩৩ বছর বয়সী কেটি মোরান ছয় মাসের প্রেমের সম্পর্কের ইতি টানেন—তবে সিদ্ধান্তটি নিতে তাঁকে সাহায্য করেছিল মানুষ নয়, বরং চ্যাটজিপিটি, এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চ্যাটবট।
মোরান স্নেহের সঙ্গে এই চ্যাটবটকে “চ্যাট” নামে ডাকেন। তিনি বলেন, “এটি আমাকে এমনভাবে নিজের ভেতরে তাকাতে বাধ্য করেছে, যা আমি আগে এড়িয়ে যেতাম।” বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের পরামর্শ নেওয়ার পরও চ্যাটজিপিটির সঙ্গেই কথোপকথনের মাধ্যমে তিনি উপলব্ধি করেন, তাঁর সম্পর্কই ছিল উদ্বেগের মূল কারণ। এক সপ্তাহের কথোপকথনের পর তিনি সম্পর্কটি শেষ করার সিদ্ধান্ত নেন।
ওপেনএআইয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, চ্যাটজিপিটিতে পাঠানো বার্তার প্রায় অর্ধেকই ‘জিজ্ঞাসা’ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ সংক্রান্ত। অনেকেই এখন বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পরিবার বা থেরাপিস্টের বদলে এআইয়ের সাহায্য নিচ্ছেন, কারণ এটি দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং সর্বক্ষণ সহজলভ্য।
জুলি নাইস, যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোর এক প্রযুক্তিকর্মী, কাজের চাপ ও মানসিক ক্লান্তিতে ভুগে গত বছরের শেষের দিকে বড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি চ্যাটজিপিটিকে বলেন, তিনি ফ্রান্সে একটি শান্ত, প্রবাসীবান্ধব শহরে যেতে চান।
চ্যাটজিপিটি তাঁকে পরামর্শ দেয় দক্ষিণ ফ্রান্সের ছোট শহর ইউজেসে যাওয়ার। জুলি এপ্রিলে সেখানে চলে যান এবং বলেন, “চ্যাটজিপিটির সাহায্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় মানসিক চাপ অনেক কমে গিয়েছিল।” যদিও পরে তিনি বুঝেছেন, শহরটিতে প্রবাসীদের বেশির ভাগই অবসরপ্রাপ্ত, তাঁর বয়সের (৪৪) সমবয়সী মানুষ কমই আছে।
ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান জানিয়েছেন, ২০–৩০ বছর বয়সী ব্যবহারকারীরাই এখন সবচেয়ে বেশি জীবনঘনিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নিতে চ্যাটজিপিটির সাহায্য নিচ্ছেন। তিনি বলেন, “তাঁরা প্রায় কোনো বড় সিদ্ধান্তই এআইকে না জিজ্ঞেস করে নেন না।”
তবে শুধু তরুণ নয়, মধ্যবয়সী মানুষও এই প্রবণতায় যুক্ত হচ্ছেন। মাইক ব্রাউন, যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরির ৫২ বছর বয়সী এক ব্যক্তি, ৩৬ বছরের দাম্পত্য জীবন নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। বন্ধু ও পরামর্শকেরা বিচ্ছেদের পরামর্শ দিলেও তিনি “পাই.এআই” নামে এক চ্যাটবটের সঙ্গে ৩০ মিনিট কথা বলে নিশ্চিত হন যে, তাঁর সিদ্ধান্ত সঠিক।
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিওনার্ড বুসিও বলেন, এআই দ্রুত ও নিরপেক্ষ উত্তর দিলেও এর “তোষামুদে” স্বভাবের কারণে এটি ব্যবহারকারীকে খুশি করতে চায়, সর্বদা সঠিক পরামর্শ দিতে নয়। তিনি বলেন, “এআইয়ের কাছে সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিলে আমাদের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”
বুসিওর পরামর্শ, “আমরা যেন নিজেদের চিন্তার জায়গা থেকে সরে না যাই—সিদ্ধান্ত নেওয়ার সৌন্দর্যও মানুষের হাতে থাকা উচিত।”
কেটি মোরান বলেন, চ্যাটজিপিটি বন্ধুর মতো কথা বলত। একবার এটি তাঁকে বলেছিল,
“আপনি এমন কাউকে পাওয়ার যোগ্য, যে আপনাকে আশ্বস্ত করবে; এমন কাউকে নয়, যার নীরবতা আপনাকে দুশ্চিন্তার গোলকধাঁধায় ফেলে দেবে।”
এই আবেগময় সংলাপেই মোরান বুঝেছিলেন—তিনি সম্পর্ক ভাঙার সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত।