ভারতীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রকর্ম শুধু ভারত উপমহাদেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং বিশ্বব্যাপী তার কাজকে ধ্রুপদি চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিজীবনে এলোমেলো হলেও, শিল্পজগতে তিনি ছিলেন আবেগী ও আপসহীন। ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর তার জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বিশেষভাবে স্মরণ করা হচ্ছে তাকে।
নীতার সংগ্রাম ও মাতৃকূটের প্রকাশ
‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০) চলচ্চিত্রে নীতা চরিত্র (সুপ্রিয়া চৌধুরী) এক নম্র ও পরিশ্রমী মেয়ে। পূর্ববঙ্গ থেকে কলকাতায় আসা তার পরিবার কলোনিতে বসবাস করে। নীতা একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে পরিবারের চার ভাইবোনের সংসার চালায়। দারিদ্র্য ও ঋণ তার প্রতিনিয়ত সঙ্গী। সংসারের বোঝা ও পরিবারের দাবিতে নীতা ধীরে ধীরে নিজের জীবনের স্বার্থ ভুলে যায়।
নীতার প্রেমিক সনৎ বিশ্বাসঘাতকতা করে, ছোট ভাইবোনরা স্বার্থপরতা প্রদর্শন করে, আর মায়ের তাচ্ছিল্য ও অভিযোগ নীতাকে আরও কষ্ট দেয়। শরীরের অসুস্থতা সত্ত্বেও সে মায়ের সঙ্গে তা ভাগ করে না। এভাবেই নীতার ভেতরে নেতিবাচক মাতৃকূট জন্ম নেয়, যা তাকে মা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
মা ও সন্তানদের সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
ঋত্বিক ঘটক ইয়ুংয়ের ‘আর্কিটাইপাল ইমেজ অব মাদার’ এবং ‘মাতৃকূট’ ধারণা ছবিতে প্রয়োগ করেছেন। মা সন্তানের জন্য যেমন লালনকারী, তেমনি ধ্বংসকারীও হতে পারেন। নীতা ও তার মায়ের মধ্যে এই দ্বৈত বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। নীতা যখন নিজেও মাতৃরূপে আবির্ভূত হয়, তখন ছবির জটিলতা আরও বেড়ে যায়।
নারী ও পুরুষ চরিত্রের ক্ষেত্রে নেতিবাচক মাতৃকূট ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। গীতার ক্ষেত্রে এটি স্বার্থপর আচরণে দেখা যায়, কিন্তু শঙ্করের ক্ষেত্রে তার মায়ের প্রতি অনাগ্রহ ও নীতার প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেখা যায়। এই দুই ধরণের আবেগ ছবিতে দেশ ও সমাজের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককেও প্রতিফলিত করে।
নীতার চরিত্রে নারীর শক্তি ও আত্মনির্ভরতা
নীতার চরিত্র নারীর সামাজিক ও পরিবারের ভূমিকার সীমাবদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। রান্নাঘর বা ঘরের কাজের কোনো স্বাভাবিক দায়িত্ব সে পালন করে না। তার শক্তি, সহনশীলতা ও আত্মত্যাগই তাকে বিশেষ করে তোলে। এর বিপরীতে গীতা শাড়ি-সাজগোজে মেয়েলি বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করে। নীতার এই দৃঢ়তা ও আত্মনির্ভরতা নেতিবাচক মাতৃকূটের প্রভাবের প্রতিফলন।
ঋত্বিক ঘটকের প্রায় প্রতিটি চলচ্চিত্রে নারী চরিত্রের মধ্য দিয়ে মাতৃরূপ ও দেশমাতৃকার প্রতীক প্রদর্শিত হয়েছে। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন,
“নারীরা সমাজ ও পরিবারের আদ্যাশক্তি। তাই আমার ছবিতে সর্বদাই নারীর প্রতি মমতা, স্নেহ ও শ্রদ্ধার প্রকাশ রাখার চেষ্টা করেছি।”
‘মেঘে ঢাকা তারা’ চলচ্চিত্রে নীতার চরিত্র কেবল গল্পের নায়ক নয়, বরং নারীর আত্মত্যাগ, শক্তি ও নেতিবাচক মাতৃকূটের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা দেখানোর একটি অসাধারণ উদাহরণ।
