
দেশে মাদকবিরোধী অভিযান ও মামলার সংখ্যা বাড়লেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অপরাধ প্রমাণ করা যাচ্ছে না। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মাদকসংক্রান্ত মোট মামলার ৫৯ শতাংশেই শেষ পর্যন্ত আসামিরা খালাস পাচ্ছেন। অর্থাৎ আদালতে প্রমাণ হয় মাত্র ৪১ শতাংশ মামলায়।
ঢাকাসহ ২৬ জেলার ৫০০টি নিষ্পত্তি হওয়া মামলার রায় বিশ্লেষণে দেখা গেছে—২৯৬টি মামলায় সব আসামি খালাস পেয়েছেন, আর সাজা হয়েছে ২০৪টিতে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, মামলাগুলোর অভিযোগপত্রে মাদকের পৃষ্ঠপোষক, আশ্রয়দাতা বা অর্থ জোগানদাতাদের কোনো তথ্যই থাকে না। ফলে মূল অপরাধীরা থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ঘাটতির তালিকায় এজাহার থেকে সাক্ষ্য পর্যন্ত
মাদক মামলায় ব্যর্থতার পেছনে রয়েছে কমপক্ষে ১৬টি বড় ঘাটতি। এর মধ্যে প্রধান ছয়টি হলো—ত্রুটিপূর্ণ এজাহার, দুর্বল তদন্ত, নিরপেক্ষ সাক্ষীর অভাব, জব্দতালিকায় অসংগতি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরস্পরবিরোধী সাক্ষ্য এবং রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন নিয়ে বিভ্রান্তি।
অন্যদিকে বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য না দেওয়া, ভুল ঠিকানা যাচাই না করা, আলামত আদালতে প্রদর্শন না করা এবং রাষ্ট্রপক্ষের গাফিলতিও মামলার ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে।
সাক্ষীর অভাব সবচেয়ে বড় বাধা
খালাস পাওয়া ২৯৬ মামলার মধ্যে ২৩৭টিতেই নিরপেক্ষ সাক্ষী না পাওয়ায় আসামিরা মুক্তি পেয়েছেন। অনেক সময় সাক্ষী হিসেবে হাজির ব্যক্তিরা আদালতে স্বীকার করেছেন যে ঘটনাস্থলে তাঁরা উপস্থিত ছিলেন না।
রাসায়নিক পরীক্ষায় অসংগতি ও তদন্তে গাফিলতি
কিছু মামলায় দেখা গেছে, জব্দ করা মাদক ও পরীক্ষার প্রতিবেদনে রঙ বা পরিমাণে অমিল। যেমন, এক মামলায় গোলাপি ইয়াবা উদ্ধারের কথা বলা হলেও প্রতিবেদনে এসেছে কমলা রঙের ইয়াবা। এসব অসংগতি আদালতে সন্দেহের জন্ম দেয়।
শুধু রাসায়নিক পরীক্ষার ভুলের কারণে ২৩টি মামলার সব আসামি খালাস পেয়েছেন। এমনকি কিছু মামলায় প্রতিবেদনই জমা দেওয়া হয়নি।
কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য না দেওয়া সাধারণ ঘটনা
৫০০ মামলার মধ্যে ১২৬টিতে তদন্ত কর্মকর্তারা আদালতে সাক্ষ্য দেননি, বাদী সাক্ষ্য দেননি ৭৯টিতে। অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণেও ৫৫টি মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছেন।
মোট মামলার ৩৮ শতাংশই মাদকসংক্রান্ত
২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে মোট ৯ লাখ ৫৭ হাজার মামলার মধ্যে মাদক মামলা হয়েছে ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৮০৯টি—অর্থাৎ মোট মামলার ৩৮ শতাংশ। তবু শাস্তির হার আশানুরূপ নয়।
মূল অপরাধীরা অধরাই রয়ে যাচ্ছে
সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি শাহ আলম বলেন, “মাদক মামলার এজাহার দায়সারা, তদন্তও তেমনই। বছরের পর বছর এই অবস্থা চলায় মূল অপরাধীরা বিচারের বাইরে রয়ে যাচ্ছে।”
দুর্বল সাফল্য সূচকই বড় সমস্যা
পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাঁদের সাফল্যের মাপকাঠি হচ্ছে উদ্ধার করা মাদকের পরিমাণ ও মামলার সংখ্যা। তদন্তের মানের ওপর কোনো পুরস্কার বা তিরস্কার নেই, ফলে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
মাদকের বিস্তার ও অর্থনীতি
ডিএনসি জানায়, দেশে ২০২৪ সালে জব্দ হয়েছে ২ কোটি ২৮ লাখ ইয়াবা, ৫০৩ কেজি হেরোইন ও বিপুল পরিমাণ ফেনসিডিল। তবু জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ধরা পড়ে মোট মাদকের মাত্র ১০ শতাংশ। বর্তমানে দেশে আনুমানিক ৮৩ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত।
অর্থ পাচারে বাংলাদেশ বিশ্বের পঞ্চম
আঙ্কটাডের ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদক ব্যবসার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর পাচার হচ্ছে প্রায় ৪৮ কোটি ডলার।
গবেষকদের মতামত
ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, “বছরের পর বছর দুর্বল তদন্তের কারণে বড় অপরাধীরা বিচারের মুখোমুখি হয় না। এই উদাসীনতা দূর না করলে মাদক নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব।”