
অন্ধকারে ঢেকে থাকা গ্রামের পুকুরে এখন ঝলমল করছে এক অদ্ভুত আলো। এই আলো বিদ্যুতের নয়—সূর্যের শক্তিতে চালিত। আলোয় আকৃষ্ট পোকামাকড় পুকুরের জলে পড়ে, আর সেগুলোই হয়ে যাচ্ছে মাছের প্রাকৃতিক খাবার। এই অভিনব সৌরশক্তিচালিত বাতিটির নাম ‘ফিলাইট (Felight)’—যা উদ্ভাবন করেছেন নওগাঁর তরুণ মো. তাসনিমুল হাসান।
পশ্চিম দুর্গাপুর গ্রামের এক সাধারণ পরিবারের সন্তান তাসনিমুল ছোটবেলা থেকেই ভাবতেন—প্রযুক্তি কি গ্রামীণ মানুষের জীবন সহজ করতে পারে না? সেই ভাবনা থেকেই শুরু ফিলাইটের যাত্রা।
বাংলাদেশে প্রায় ৪২ লাখ মাছের পুকুরে লাখো কৃষক কাজ করেন। কিন্তু বিদ্যুৎ ও মাছের খাবারের অতিরিক্ত খরচ তাঁদের আয়ে বড় প্রভাব ফেলে। এই সমস্যার সমাধান খুঁজতেই তাসনিমুল তৈরি করেন ফিলাইট—একটি সৌরচালিত বাতি যা পোকামাকড় আকৃষ্ট করে মাছের খাবার তৈরি করে।
ফিলাইট একটি সৌরশক্তিচালিত পোকা আকৃষ্টকারী আলো। রাতে পুকুরের মাঝখানে স্থাপন করা হলে আলোয় পোকামাকড় ভিড় করে, পরে পানিতে পড়ে যায় এবং মাছের খাদ্যে পরিণত হয়। এতে
বিদ্যুৎ খরচ একেবারেই নেই,
মাছের খাবারের খরচ কমে যায়,
আর উৎপাদন বেড়ে যায়।
২০২৪ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে হাতে সীমিত টাকা ও সম্পদ নিয়ে শুরু করেন তাসনিমুল। অনেকেই তাঁকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন, কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে স্থানীয় কয়েকটি পুকুরে ফিলাইট বসানোর পর কৃষকেরা নিজেরাই জানান, মাছের উৎপাদন বেড়েছে এবং বিদ্যুৎ খরচ শূন্য।
আজ দেশের বিভিন্ন জেলায় শতাধিক পুকুরে ব্যবহৃত হচ্ছে ফিলাইট। কৃষকেরা বলছেন—এই আলো শুধু পুকুর নয়, তাঁদের জীবনে এনেছে আশার আলো।
তাসনিমুল বলেন,
“আমার লক্ষ্য, বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে যেন ফিলাইটের আলো জ্বলে। যত দিন তরুণেরা স্বপ্ন দেখেন, তত দিন অন্ধকার স্থায়ী হতে পারে না।”
তাসনিমুলের মতে, শহর-গ্রামের সুযোগের পার্থক্যই দেশের উন্নয়নের পথে বড় বাধা। তিনি চান এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে গ্রামের তরুণরাও প্রযুক্তি, শিক্ষা ও তহবিলের সমান সুযোগ পাবেন—যাতে তাঁর মতো আরও উদ্ভাবক উঠে আসতে পারেন।
মাত্র দেড় বছরের মধ্যেই ফিলাইট পেয়েছে একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও স্বীকৃতি—
Starship Inspiring Ten 2025,
Simcubator Bootcamp জয়,
Sustainlaunch Lab-এ প্রথম রানারআপ,
Startup World Cup 2025-এর শীর্ষ প্রতিযোগী হিসেবে নির্বাচিত।
কিন্তু তাসনিমুলের কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো কৃষকের কণ্ঠ—
“ভাই, পুকুরে আপনার ফিলাইট দিলে মাছ ভালো বাড়ছে।”
তাসনিমুল বিশ্বাস করেন, উন্নয়ন ও পরিবেশ একে অপরের পরিপূরক হতে পারে। ফিলাইট তারই এক উদাহরণ—প্রযুক্তি, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নের সফল সমন্বয়।