
১৯৯০ সাল। মিরপুরে থাকি। এখন যেখানে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল, সেখান থেকে বাসে উঠেছি। ১১ নম্বরে বাস থামলে পাশের সহযাত্রী জানালার বাইরে তাকিয়ে পরিচিত একজনকে পেয়ে বললেন, “ঢাকায় যাই।” কথাটা শুনে মনে পড়ল লেখিকা প্রতিভা বসুর আত্মজীবনী জলছবি—যেখানে তাঁর বাবাও বকশীবাজার থেকে মিরপুরে যেতেন চাকরির সুবাদে।
১৯৯৮ সাল। সনি সিনেমা হলের নিচে তখন গ্রামীণ উদ্যোগের দোকান। সন্ধ্যায় আমি আর প্রয়াত ডিজাইনার এমদাদ হক ভ্যানের ওপর বসে আড্ডা দিতাম। তাঁর ডিজাইন করা পাঞ্জাবি সেই বছর জনপ্রিয়তায় হটকেক হয়ে ওঠে। পরে এই প্রতিষ্ঠান থেকেই ২০০০ সালে জন্ম নেয় নতুন ফ্যাশন ব্র্যান্ড বাংলার মেলা। আর সনি সিনেমা হলের উল্টো দিকেই ২০১৮ সালে আসে আড়ং।
২০০৭ সালে মিরপুরের রাস্তাঘাট বদলাচ্ছে। কালশী থেকে ইসিবি পর্যন্ত বালু ফেলে তৈরি হচ্ছিল নতুন রাস্তা। ডিওএইচএস তখনও হয়নি, চারপাশে জলাশয় দখল আর বিল্ডিং নির্মাণে ব্যস্ততা।
এই পরিবর্তনের শুরু ১৯৯৩ সালে ইনডোর স্টেডিয়াম নির্মাণের সময় থেকেই। ২০০৬ সালে মিরপুর স্টেডিয়ামের উদ্বোধন এলাকাটিকে বদলে দেয়। ক্রিকেটের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে মিরপুর হয়ে ওঠে নতুন প্রাণকেন্দ্র। স্টেডিয়ামের সামনে গড়ে ওঠে স্পোর্টস সামগ্রীর দোকান, মার্কেট আর নতুন বাণিজ্যকেন্দ্র।
তখন শাহ আলী মার্কেট, পূরবী মার্কেট আর মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট ছিল মিরপুরের জনপ্রিয় শপিং স্পট। ২০০৬ সালে পারসোনা বিউটি স্যালন মিরপুরে আসে, যা পরিবর্তনের নতুন অধ্যায় রচনা করে।
বেনারসিপল্লিতে তখন তাঁতিরা ব্যস্ত ছিলেন বেনারসি ও কাতান বুননে। মিরপুরের বেনারসি শাড়ি পৌঁছেছিল দেবদাস সিনেমার সেটেও—মাধুরী দীক্ষিত ও ঐশ্বরিয়া রাইয়ের পরনের সেই শাড়ি মিরপুর থেকেই গিয়েছিল।
২০০০ সালে বাংলার মেলার হাত ধরে মিরপুরে ফ্যাশন ব্র্যান্ডের বিস্তার ঘটে। একে একে যোগ দেয় অন্যান্য বড় ব্র্যান্ড, তৈরি হয় নতুন ফ্যাশন স্ট্রিট। আড়ং, লা রিভ, চিলক্সসহ অসংখ্য রেস্টুরেন্ট ও পোশাক ব্র্যান্ড মিরপুরকে করে তোলে আধুনিক কেনাকাটার কেন্দ্র।
ডিওএইচএস ও মেট্রোরেলের সংযোজন মিরপুরবাসীর জীবনকে আরও সহজ করেছে। একসময় যেখানকার মানুষ বলত “ঢাকায় যাচ্ছি”, এখন আর কেউ তা বলে না—কারণ মিরপুরই এখন ঢাকার প্রাণকেন্দ্র।
তিন দশকে বদলে গেছে মিরপুরের চালচিত্র—টিনের দোকান, তাঁতির তাঁত থেকে আজকের ঝলমলে শোরুম, ফুড কোর্ট আর ফ্যাশন হাউস। মিরপুর এখন শুধু একটি এলাকা নয়, বরং মেগাসিটি ঢাকার প্রাণস্পন্দন—যেখানে ঐতিহ্য, আধুনিকতা ও নাগরিক সংস্কৃতির সুন্দর সংমিশ্রণ।