
নির্জন কবরস্থানের এক কোণে ছোট্ট একটি কবর। মাটি এখনো ভেজা। বাঁশের খুঁটিতে কালো ফিতা দিয়ে আটকানো সাদা কাগজে লেখা—‘বেবী অফ আঁখিমনি-রন্টি (কন্যাসন্তান)’। দাফনের তারিখ ১২ নভেম্বর।
নারায়ণগঞ্জের ভুঁইগড়ের মামুদপুর কবরস্থানে এই নামহীন শিশুর কবরের পাশে দাঁড়ালে বোঝাই যায় না—জন্মের পর কিংবা মৃত্যুর মুহূর্তে সে কোনো মা–বাবা বা স্বজনকে পাশে পায়নি। তার চিকিৎসা ও দাফনের ব্যবস্থা করেছে ডা. মুজিব নিউবর্ন ফাউন্ডেশন।
৫ নভেম্বর রাত ৩টার দিকে কে বা কারা শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিলতা নিয়ে নবজাতকটিকে নারায়ণগঞ্জের বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করে। ভর্তি কাগজে মায়ের নাম লেখা ছিল—আঁখিমনি-রন্টি। কিন্তু এরপর থেকেই কেউ আর খোঁজ নেয়নি। দেওয়া নম্বরে ফোন করলেও কেউ ধরেনি।
মুজিব নিউবর্ন ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক মজিবুর রহমান জানান, আইনগত ঝামেলা এড়াতে নবজাতক উদ্ধার, মৃত্যু ও দাফন—সবই প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে করতে হয়। সব অনুমতি সংগ্রহ করতে করতে বিকেল হয়ে যায়। জন্ম থেকে মৃত্যু—দুটো জায়গাতেই ভোগান্তি সঙ্গী হয় এই কন্যাশিশুর।
নবজাতকের মৃত্যুর কয়েক দিন পর ১৪ নভেম্বর মারা যান ৯৫ বছর বয়সী মো. আবদুল আজিজ চৌধুরী, রাজধানীর মেরুল বাড্ডার রাশমনা আপনঘর বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা। তিনি মৃত্যুর আগে স্বজনদের দেখতে চেয়েছিলেন বহুবার। কেউ আসেনি। এমনকি মৃত্যুর পরও লাশ নিতে কেউ এগিয়ে আসেননি।
বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষ আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে তাকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করেছে।
বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা আরিফুর রহমান জানান, তিন বছর ধরে সবাই তাকে ‘কবি কাকা’ নামে চিনত। সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চাইতেন না। অসুস্থতার সময় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁরা রূঢ় আচরণ করে ফোন কেটে দেন।
দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডেও আরেক নবজাতককে ফেলে রেখে চলে যায় তার পরিবার। শিশুটির পাশে পাওয়া যায় একটি বাজারের ব্যাগ—ভেতরে কিছু ওষুধ আর একটি চিরকুট:
“আমি মুসলিম। আমি একজন হতভাগী। পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে বাচ্চা রেখে গেলাম। দয়া করে কেউ নিয়ে যাবেন।”
প্রতিবেদন প্রকাশের পর বহু মানুষ শিশুটিকে দত্তক নিতে আগ্রহ দেখান। বর্তমানে সে চিকিৎসাধীন।
মুজিব নিউবর্ন ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া আট নবজাতক চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। বর্তমানে হাসপাতালে থাকা সাতটি নবজাতক নতুন জীবনের জন্য লড়ছে। অনেক শিশু আদালতের মাধ্যমে নতুন পরিবারও পেয়েছে।
জন্মের মুহূর্ত থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অবহেলা, নির্জনতা এবং অস্বীকারের এই গল্পগুলো আমাদের সমাজের এক গোপন বেদনার মুখোমুখি দাঁড় করায়—যেখানে নবজাতক কিংবা বৃদ্ধ কেউই কখনো কখনো পরিবারের স্নেহ, পরিচয় বা দায়িত্ব পায় না। এটি যেন কারও জীবনে না ঘটে—এমন দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।