
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের দিনমজুর আবদুল হান্নান তাঁর পাঁচ কাঠার জমিতে টিনের ছাপরার ছোট ঘরে স্ত্রী ও চার সন্তানকে নিয়ে থাকেন। সীমাহীন আর্থিক কষ্টের মধ্যেও মেয়েদের পড়াশোনা কখনো থেমে যেতে দেননি তিনি। মা–বাবার ত্যাগ, কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য অধ্যবসায়ের ফল হিসেবে আজ তাঁর দুই মেয়ে বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশের সেবায় যুক্ত হয়েছেন।
পরিবারের এই অসাধারণ অর্জন এখন শুধু তাঁদের নয়, পুরো এলাকার গর্ব।
হান্নানের তিন মেয়ে ও এক ছেলে। তাঁদের মধ্যে দুইজন—সারমিন খাতুন ও খাদিজা খাতুন—বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়েছেন। ছোট বোন খাদিজা ৪১তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে, আর বড় বোন সারমিন ৪৪তম বিসিএসে পশুসম্পদ ক্যাডারে নিয়োগ পেয়েছেন।
দুই বোনের ভাষ্যমতে, তাঁদের এ অবস্থানে তুলে এনেছেন সর্বাধিক তাঁদের মা—যিনি ঘর সামলানোর পাশাপাশি মেয়েদের পড়াশোনায় ছিলেন সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
দুই মেয়ের সাফল্যে আবেগাপ্লুত বাবা আবদুল হান্নান বলেন,
‘কষ্ট কর্যাছি। মেয়েরা সেই কষ্টের মর্ম বুঝ্যাছে। বাপ–মাক সম্মান দ্যাখাইতে পারছে। গাঁয়ের মানুষ এখন আমাদের অনেক সম্মান করে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দাওয়াত দ্যায়।’
বালিয়াডাঙ্গা উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আবদুর রাজ্জাকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রথম আলোর ‘অদম্য মেধাবী’ সিরিজে দুই বোনের গল্প প্রকাশিত হয়। এরপর সারমিন পান প্রথম আলো ট্রাস্টের বৃত্তি, আর খাদিজা পান হামদর্দ লিমিটেডের সহায়তা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর সারমিনের চলার পুরো ভরসা ছিল সেই বৃত্তি। ছোট বোন খাদিজাও একই বিভাগে ভর্তি হন। দুজন মিলে বৃত্তির টাকা ভাগাভাগি করে পড়াশোনা চালিয়েছেন।
একটি সিঙ্গেল সিটে দুই বোন থাকা, একই বিষয়ে পড়ায় একই বই ব্যবহার—সব মিলিয়ে দারিদ্র্যের ভেতর থেকেও এগিয়ে গেছেন জেদ ও পরিশ্রম নিয়ে।
বিসিএসে উত্তীর্ণ হওয়ার পর বড় বোন সারমিন বলেন,
‘আমাদের কষ্টের পথ অনেক লম্বা ছিল। মা–বাবার ত্যাগ আর প্রথম আলো ট্রাস্টের সহায়তা ছাড়া আজকের অবস্থানে আসা সম্ভব হতো না।’
বিদ্যুৎ না থাকলে কুপির আলোয় পড়ছেন, কখনো কেরোসিনের টাকা না থাকলে প্রতিবেশীর বাড়ির আলোয় পড়াশোনা করেছেন—এ রকম বহু স্মৃতি তাঁর জীবনের অংশ।
শিক্ষক আবদুর রাজ্জাক বলেন,
এই দুই বোনের সাফল্য প্রমাণ করেছে—সুযোগ, সহায়তা ও সংকল্প থাকলে দারিদ্র্যও হার মানে।
দিনমজুরের মেয়েরা আজ বিসিএস ক্যাডার—এটি এলাকার মেয়েদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা।
তাঁদের সম্মানে স্থানীয় সংগঠন ‘সিদ্দিক আহমেদ শ্রদ্ধা নিবেদন পরিষদ’ সংবর্ধনার আয়োজনও করেছে।
সারমিন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন,
‘আমার অর্জন শুধু আমার নয়—এটা আমার মা–বাবারও। তাঁদের ত্যাগ আমাকে এগিয়ে দিয়েছে।’
প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেওয়া ছোট বোন খাদিজা বলেন,
‘এমন মা–বাবার জন্যই আমরা গর্ব করি। আর বড় বোনের ছায়ায় থাকায় আমি পড়াশোনা এগিয়ে নিতে পেরেছি।’