ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পোশাকশ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে (২৭) পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় এলাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া চলছে। তবে ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দা ও কারখানার সহকর্মীদের মধ্যে দেখা গেছে অস্বাভাবিক নীরবতা। কারখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, পুলিশে খবর দেওয়া হলেও উত্তপ্ত ‘মব’ ঠেকানো সম্ভব হয়নি; আর পুলিশ দাবি করছে, সময়মতো জানানো হলে দীপুর প্রাণ বাঁচানো যেত।
গত বৃহস্পতিবার রাতে ভালুকার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের ডুবালিয়াপাড়া এলাকার পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেড কারখানা থেকে দীপুকে ধরে নিয়ে যান একদল লোক। পরে ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের স্কয়ার মাস্টারবাড়ী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সড়কের বিভাজকের একটি গাছে তাঁকে বিবস্ত্র করে ঝুলিয়ে আগুন দেওয়া হয়। দীপু তারাকান্দা উপজেলার মোকামিয়াকান্দা গ্রামের রবি চন্দ্র দাসের ছেলে। এ ঘটনায় তাঁর ভাই অপু চন্দ্র দাস অজ্ঞাতপরিচয় ১৪০–১৫০ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন।
কারখানার ভেতরের উত্তেজনা, বাইরের জড়ো হওয়া লোকজন
ঘটনার দিন সন্ধ্যার পর কারখানার একটি ফ্লোরে কথোপকথনের সময় দীপু মহানবী (সা.) সম্পর্কে কটূক্তি করেন—এমন অভিযোগ থেকে উত্তেজনার সূত্রপাত বলে দাবি করেছেন কয়েকজন শ্রমিক। বিষয়টি দ্রুত পুরো ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ে। কারখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, পরিস্থিতি শান্ত করতে চেষ্টা করা হয় এবং শিল্প পুলিশ ও থানা-পুলিশকে জানানো হয়।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রাত সাড়ে আটটার দিকে কারখানার বাইরে লোকজন জড়ো হয়ে ফটক ভাঙার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে পকেট গেট ভেঙে দীপুকে বের করে নেওয়া হয়। কারখানার ভেতরের ঘটনা কীভাবে বাইরে ছড়িয়ে পড়ল—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর কেউ দিতে পারেনি।
দায় নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য
কারখানার জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ) উদয় হোসেন বলেন, দীপুকে নিরাপত্তার কথা ভেবে গেট পর্যন্ত নেওয়া হয়েছিল; তাঁকে বাইরে তুলে দেওয়া হয়নি। তবে উত্তপ্ত জনতা জোর করে গেট ভেঙে নিয়ে যায়। অন্যদিকে শিল্প পুলিশ বলছে, কারখানার ভেতরের ঘটনা ভেতর থেকেই বাইরে গেছে এবং সংকটের শুরুতেই পুলিশকে জানানো হয়নি। ভালুকা মডেল থানার ওসি জানান, সময়মতো খবর পেলে উদ্ধার সম্ভব ছিল।
ধর্ম অবমাননার অভিযোগ নিয়ে ধোঁয়াশা
র্যাব জানায়, ধর্ম অবমাননার বিষয়টি অস্পষ্ট; দীপু ঠিক কী বলেছিলেন, তা কেউ নিশ্চিত করতে পারেননি। পূর্বশত্রুতার বিষয়টিও তদন্তাধীন। এ পর্যন্ত অন্তত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
প্রতিবাদ ও ক্ষতিপূরণের দাবি
রোববার গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠনগুলোর ব্যানারে কারখানার সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে ঘটনাস্থলে সমাবেশ হয়। বক্তারা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও নিহতের পরিবারকে একজীবনের আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান।
এদিকে কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারে তারা পূর্ণ সহযোগিতা করবে এবং নিহতের পরিবারকে সর্বোচ্চ সহায়তা দেওয়া হবে।
