
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। উপকূলে ভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পাশাপাশি পাহাড়ি ভূমিধস ও খরার মতো দুর্যোগ মানুষের জীবন ও জীবিকাকে কঠিন করে তুলছে। এই বাস্তবতায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনরক্ষায় তরুণদের সম্পৃক্ত করতে কাজ করছে জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনসিডিএফ), ইউএনডিপি এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের লজিক (লোকাল গভর্নমেন্ট ইনিশিয়েটিভ অন ক্লাইমেট চেঞ্জ) প্রকল্প।
বাংলাদেশ সরকার, সুইডেন, ডেনমার্ক, ইউএনসিডিএফ ও ইউএনডিপির যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই প্রকল্প দেশের নয়টি জেলায় ২৯১টি ওয়ার্ডে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীকে যুক্ত করেছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে গড়ে ওঠা যুব প্ল্যাটফর্মে শিক্ষার্থীরা শুধু জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় কাজ করছেন না, বরং তহবিল ব্যবস্থাপনা, সচেতনতা বৃদ্ধি ও নেতৃত্ব বিকাশেও ভূমিকা রাখছেন।
পটুয়াখালীর চর মনতাজ দ্বীপ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে নিয়মিত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বেড়ে ওঠা সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী অন্তু রানী পড়াশোনার পাশাপাশি লজিক প্রকল্পে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। ২০২৩ সালে স্থানীয় তরুণ ও নারীদের সঙ্গে তিনি শুরু করেন “সাগরকন্যা পিওর ড্রাই ফিশ” নামের শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণন ব্যবসা। নারী নেতৃত্বে পরিচালিত এই ব্যবসায় অন্তু দায়িত্ব নিয়েছেন আর্থিক ব্যবস্থাপনা, প্রচার ও সরকারি দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগের।
২০২৫ সালে তিনি ঢাকায় বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিটের ইয়ুথ এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ এক্সপোতে অংশ নেন। সেখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সামনে সাগরকন্যা ড্রাই ফিশের সাফল্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন।
কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার চরাঞ্চল বন্যা ও নদীভাঙনের জন্য পরিচিত। এই এলাকার তরুণ মো. ফারিদুল ইসলাম ২০২০ সালে লজিক প্রকল্পের প্রশিক্ষণ পান। তিনি স্থানীয়ভাবে সচেতনতা সৃষ্টি ও সমবায় কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে ধীরে ধীরে কমিউনিটি লিডার হয়ে ওঠেন।
ফারিদুল তরুণদের সংগঠিত করে গড়ে তোলেন “ইউথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিস”। তাদের উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে টেকসই কৃষি, যেমন কুইনোয়া ও চিয়া উৎপাদন; নারী উদ্যোক্তাদের মুরগি পালন ও হস্তশিল্পে সম্পৃক্ত করা; এবং স্থানীয় সবুজ পণ্যের জাতীয় পর্যায়ে প্রদর্শনী। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ বিজনেস সামিটে তারা কুইনোয়া ও চিয়া বীজ প্রদর্শন করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রশংসা পান। বর্তমানে ইউথনেট কুড়িগ্রামের তিনটি উপজেলায় চার শতাধিক তরুণকে যুক্ত করেছে।
রাঙামাটির সাফারি ইউনিয়নের কলেজপড়ুয়া সবিন চাকমা পাহাড়ি এলাকায় লজিক প্রকল্পের সঙ্গে কাজ করছেন। ভূমিধস ও পানিসংকটে ভুগতে থাকা স্থানীয় জনগণের জন্য তিনি একটি সৌরচালিত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করেছেন। প্রাকৃতিক জলাশয় ও সৌরশক্তি ব্যবহার করে তৈরি এই উদ্যোগ প্রতিদিন শতাধিক মানুষকে নিরাপদ পানি সরবরাহ করছে।
বাংলাদেশ একই সঙ্গে দুটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি—জলবায়ু সংকট ও যুব বেকারত্ব। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ ১৫–২৯ বছর বয়সী তরুণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবুজ খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেকসই কৃষি, ইকো-ট্যুরিজম ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় তরুণ উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে।
শিক্ষার্থীরা এখন জলবায়ু পরিবর্তনকে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবেও দেখছেন। ঝুঁকি চিহ্নিত করে সমাধানের পথ বের করা এবং সেই জ্ঞান সম্প্রদায়ের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎসহ পুরো সমাজকে রক্ষায় ভূমিকা রাখছেন।