
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে উঠেই ব্যাপক প্রতিবাদ আর ওয়াকআউটের মুখে পড়েন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ২৬ সেপ্টেম্বরের সেই অধিবেশনে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা একযোগে কক্ষ ত্যাগ করেন। প্রায় ফাঁকা হলে তিনি বক্তৃতা দেন।
‘গাজার কসাই’ খ্যাত নেতানিয়াহু ওয়াকআউটকে উপেক্ষা করার ভান করলেও তাঁর অস্বস্তি ধরা পড়ে। তবে অভিজ্ঞ রাজনীতিক হিসেবে তিনি দ্রুত কৌশল নেন। বক্তৃতায় বলেন, “অনেক বিশ্বনেতা প্রকাশ্যে আমাদের নিন্দা করেন, আবার গোপনে ধন্যবাদ দেন।”
তবে এ বক্তব্যের কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেননি তিনি। কোন কোন বিশ্বনেতা এমন দ্বিচারিতা করছেন, তা-ও জানাননি। ফলে বিষয়টি নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু মূলত দুই উদ্দেশ্যে এমন মন্তব্য করেছেন:
১. ওয়াকআউট করা নেতাদের নৈতিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ করা।
২. নিজেকে ঘিরে তৈরি হওয়া অপমানকে ঢেকে দেওয়া।
গবেষকেরা বলছেন, নেতানিয়াহু তাঁর বক্তৃতায় কৌশলী শব্দ, প্রতীকী ভাষা ও আক্রমণাত্মক বাগ্মিতা ব্যবহার করে সমালোচকদের দুর্বল করার চেষ্টা করেন। অতীতেও তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সমালোচকদের বিরুদ্ধে এমন কৌশল নিয়েছেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলায় গাজায় এখন পর্যন্ত ৬৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত ও প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার আহত হয়েছেন। লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবিক বিপর্যয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের এক স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদনে গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘জাতিগত নিধন’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে এবং এর দায় নেতানিয়াহুসহ ইসরায়েলি নেতৃত্বের ওপর চাপানো হয়েছে।
যদিও নেতানিয়াহুর বক্তব্য প্রমাণহীন, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ‘গোপন সমর্থন’-এর দৃষ্টান্ত রয়েছে। যেমন—যুক্তরাজ্য প্রকাশ্যে গাজায় ইসরায়েলের হামলার সমালোচনা করলেও ২০২৫ সালের আগস্টে দেশটি থেকে ইসরায়েলে ১ লাখ ১০ হাজার বুলেট ও অস্ত্রের যন্ত্রাংশ পাঠানো হয়। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য সম্প্রতি ফিলিস্তিনকেও রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
এমন দ্বিচারিতা আসলে নেতানিয়াহুর বক্তব্যকে পুরোপুরি খারিজ করা কঠিন করে তোলে। প্রকাশ্যে সমালোচনা আর আড়ালে অস্ত্র বিক্রি বা কূটনৈতিক সমর্থন এক ধরনের ‘গোপন ধন্যবাদ’ বলেই দেখা যেতে পারে।
গাজায় যুদ্ধ বন্ধের নামে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ২০ দফা পরিকল্পনা দ্রুত অনুমোদন করেছে মুসলিম বিশ্বের কিছু প্রভাবশালী দেশ। ইতিহাসবিদ হাসান বোখারির মতে, এটি ফিলিস্তিনের প্রতি বড় ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা এবং ইসরায়েলের গণহত্যাকে বৈধতা দেওয়ার কৌশল।
সব মিলিয়ে, জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর বক্তব্যকে অনেকে নিছক বাগ্মিতা মনে করলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতির দ্বিচারিতার প্রেক্ষাপটে তা পুরোপুরি অমূলকও বলা যাচ্ছে না।