
বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা সুন্দর কিন্তু বঞ্চিত দ্বীপ উড়িরচর এখন রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, ভূমি–বাণিজ্য ও জলদস্যুতার কবলে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষদের আশ্রয়স্থল এই দ্বীপটি ধীরে ধীরে বিত্তশালী ও প্রভাবশালী মহলের দখলে চলে যাচ্ছে।
ভূমি-বাণিজ্যের মাধ্যমে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য বরাদ্দযোগ্য জমি অস্থানীয় প্রভাবশালীদের হাতে চলে যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভূমি বন্দোবস্ত প্রকল্প (সিডিএসপি) ভূমিহীনদের সহায়তার বদলে দখলদারদের সুযোগ করে দিচ্ছে। ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষরা বারবার জমি কিনেও মালিকানা পাচ্ছেন না।
উড়িরচরের ইতিহাসে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও জলদস্যুদের আঁতাত দীর্ঘদিনের। স্থানীয় প্রভাবশালীরা জলদস্যু বাহিনীকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে নিপীড়ন করছে। ভোটের রাজনীতিতেও এই উদ্বাস্তুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। ২২ বছর ধরে এখানে ইউনিয়ন পরিষদের কোনো নির্বাচন হয়নি, নেই পর্যাপ্ত শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা নিরাপত্তা সেবা।
নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এই দ্বীপ। নতুন ভূমি জেগে উঠলেও তা টেকে না দীর্ঘদিন। ফলে জলবায়ু উদ্বাস্তুরা এক চর থেকে অন্য চরে যাযাবরের মতো জীবনযাপন করছেন। বর্তমানে প্রায় ১২ হাজার পরিবার এখানে বাস করে, যাদের পূর্বের ঠিকানা এখন সাগরের তলায়।
চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলার সীমানা নির্ধারণে উড়িরচর দ্বিখণ্ডিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবে এই সীমানা নির্ধারণ হয়েছে, যা সামাজিক দ্বন্দ্ব ও পরিচয় সংকট তৈরি করেছে। সাবেক মন্ত্রী মওদুদ আহমদ ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সময় থেকেই এ বিভাজন জোরদার হয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন অনুযায়ী ভূমিহীনদের অগ্রাধিকার থাকলেও বাস্তবে অস্থানীয় ধনীদের বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ আছে, ঘুষের বিনিময়ে জমি দেওয়া হচ্ছে—কেউ দিয়েছেন ১০ হাজার, কেউ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। অনেকেই ঘুষ দেওয়ার পরও জমি পাননি।
উড়িরচরে নেই ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ব্যবহৃত হচ্ছে পুলিশ ফাঁড়ি হিসেবে, মাধ্যমিক বিদ্যালয় চলছে মাত্র তিনজন শিক্ষক নিয়ে। স্থানীয় সাংবাদিক নুর নবীর ভাষায়, “এখানকার মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা আর বাস্তু নিরাপত্তা—সব দিক থেকেই বঞ্চিত। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এই দ্বীপটিকে ক্ষমতাবানদের এক উপনিবেশে পরিণত করেছে।”
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবদুল বায়েস বলেন, “উড়িরচরের সমস্যা বাংলাদেশের সব চরাঞ্চলের মতোই গভীর। এসব এলাকার মানুষ ক্ষমতার কাঠামোর একেবারে নিচে—তাদের কণ্ঠ শোনা যায় না বলেই দশকের পর দশক সমস্যা থেকে যায়।”
উপসংহার:
উড়িরচর আজ শুধু জলবায়ু উদ্বাস্তুদের দ্বীপ নয়, বরং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, প্রভাবশালী দখলদারি ও প্রশাসনিক উদাসীনতার এক প্রতীক। এখানে প্রকৃতির সঙ্গে যেমন লড়াই, তেমনি ক্ষমতার হাতেও নিপীড়নের শিকার নিরীহ মানুষরা।