রাঙামাটির বাঘাইছড়ির সাজেক পর্যটনকেন্দ্রের রুইলুই এলাকায় ঢুকতেই চোখে পড়ে ছোট একটি লুসাই সাংস্কৃতিক পার্ক। মাত্র ৩০ টাকার টিকিটে দর্শনার্থীরা সেখানে খুঁজে পান লুসাই জনগোষ্ঠীর আদি জীবন, সংস্কৃতি, পোশাক, অস্ত্র, বাদ্যযন্ত্রসহ এক অকৃত্রিম লুসাই গ্রাম। এমনকি লুসাইদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে ছবি তোলার ব্যবস্থাও রয়েছে।
সম্প্রতি সাজেকে গিয়ে দেখা যায়, ‘লুসাই ভাংখুয়া পার্ক’ এখন দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ। সাজেক একসময় লুসাই–অধ্যুষিত ছিল। বর্তমানে অনেক পরিবার ভারতের মিজোরামে চলে গেলেও রুইলুই অঞ্চলে এখনো লুসাই সংস্কৃতির প্রভাব রয়েছে। রুইলুই মৌজার হেডম্যান লালথাঙ্গা লুসাই ও তাঁর পরিবারের উদ্যোগেই পার্কটি গড়ে উঠেছে—সাজেকের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তুলে ধরাই যার মূল উদ্দেশ্য।
লুসাই: প্রাচীন যোদ্ধা জাতি
গবেষণা অনুযায়ী লুসাইরা জো জাতির একটি প্রধান জনজাতি। বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারতের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় তাঁদের বসবাস। পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রাচীন যোদ্ধা জাতি হিসেবে লুসাইদের পরিচিতি রয়েছে। স্বাধীনচেতা এই জাতিকে বশে আনতে ১৮৭১ সালে পরিচালিত হয় লুসাই দমন অভিযান। তবুও সহজে বশ মানেনি তারা। লুসাই যোদ্ধাদের বীরত্ব, যুদ্ধকৌশল, টংঘর ও অস্ত্রসহ ‘জলবুক’ নামের যুদ্ধঘরের নমুনা দেখা যায় পার্কে।
পার্কের আয়োজন
পার্কে লুসাইদের ঐতিহ্যবাহী তাঁতে বোনা পোশাক—পুয়ানফেল, করচুং, করচুর, পুয়ানবি—দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। ১০০ টাকায় এসব পোশাক পরে ছবি তোলার সুযোগ আছে। ঐতিহ্যবাহী লুসাই মাচাংঘরে রয়েছে শিকারের ট্রফি, সাংস্কৃতিক উপকরণ ও লুসাই যোদ্ধাদের গল্প। পার্কে আছে দোকানদারবিহীন দোকানও, যেখানে মূল্যে লেখা রয়েছে—ইচ্ছামতো মূল্য পরিশোধ করে স্মারক সংগ্রহ করা যায়।
পর্যটকদের অভিজ্ঞতা
চট্টগ্রামের নবদম্পতি জয় ধর ও অনন্যা বণিক জানান, সাজেক ও লুসাই পার্ক তাঁদের মুগ্ধ করেছে। ঢাকার রাকিব হোসেন ও তমা প্রথমবার সাজেক এসে প্রকৃতি ও লুসাই সংস্কৃতিতে বিমোহিত হয়েছেন।
আয়ের উৎস ও মানবিক উদ্যোগ
পার্কের ব্যবস্থাপক কালাচাঁন ত্রিপুরা জানান, ছুটির দিন বাদে প্রতিদিন ১৫–২০ হাজার টাকা আয় হয়, আর ছুটির দিনে তা ৩০–৪০ হাজারে পৌঁছায়। ফেব্রুয়ারির অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তাতেও ব্যবহৃত হয়েছে এই আয়।
বিলুপ্তপ্রায় লুসাই সংস্কৃতি রক্ষার প্রয়াস
পার্কের প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের সদস্য নুপুই লুসাই জানান, লুসাই জনসংখ্যা কমে যাওয়ায় তাঁদের ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তাই পার্কটি তৈরি করা হয়েছে সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবন, পর্যটন সমৃদ্ধি এবং পারিবারিক আয়ের উদ্দেশ্যে।
সাজেকের অপার সৌন্দর্যের সঙ্গে লুসাই সাংস্কৃতিক পার্ক যোগ করেছে অনন্য আকর্ষণ—যেখানে প্রকৃতির পাশাপাশি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জীবন্ত গল্প মুগ্ধ করে পর্যটকদের।