দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের মধ্যে সরকারের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ ও সম্ভাব্য প্রার্থীরা। কেউ পুলিশের একটি দল বা গানম্যান চেয়েছেন, কেউ আবার আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের আবেদন করেছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এ ধরনের আবেদনের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫ জন রাজনীতিবিদ নিরাপত্তা, গানম্যান অথবা অস্ত্রের লাইসেন্স চেয়ে আবেদন করেছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ একসঙ্গে নিরাপত্তা ও অস্ত্রের লাইসেন্স চেয়েছেন। এ ছাড়া প্রায় ২৫ জন সরকারি কর্মকর্তাও আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছেন।
নিরাপত্তা চাওয়া রাজনীতিবিদদের মধ্যে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান, জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব ইউনুস আহম্মেদ সেখ। তাঁদের কেউ সার্বক্ষণিক গানম্যান, কেউ বাসভবনে সশস্ত্র পুলিশ, আবার কেউ পুলিশি গাড়ি চেয়ে আবেদন করেছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করার ঘটনার পর রাজনীতিবিদদের মধ্যে নিরাপত্তা চাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। তিনি বলেন, কাদের অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হবে বা কাদের জন্য গানম্যান নিয়োগ করা হবে—এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চলতি সপ্তাহে বৈঠকে বসবে মন্ত্রণালয়।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায় শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করার ঘটনার পর। গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পুরানা পল্টনে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর মারা যান। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের এক সাবেক নেতা হলেও এখনো তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
এদিকে ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট গ্রহণ এবং ২২ জানুয়ারি থেকে প্রচার শুরু হওয়ার কথা। নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ১৪ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও জাতীয় সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের অনুকূলে আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স ও রিটেইনার নিয়োগ নীতিমালা–২০২৫’ জারি করে। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও প্রার্থীদের জন্য আগ্নেয়াস্ত্র ও সশস্ত্র নিরাপত্তা দেওয়ার লক্ষ্যে এই নীতিমালা করা হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ১৭ ডিসেম্বর দলের আমির শফিকুর রহমানের জন্য সার্বক্ষণিক গানম্যান ও বাসভবনের নিরাপত্তায় সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েনের আবেদন করা হয়। দলের মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, সাম্প্রতিক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার প্রেক্ষাপটে এবং জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিধি মোতাবেক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং প্রায় এক মাস আগে আবেদন করলেও এখনো কোনো সাড়া পাননি। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুও একই ধরনের আবেদন করেছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি পুলিশ সদস্য ও গানম্যান চেয়েছেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের জন্য হুমকির পরিবেশ তৈরি হয়েছে এবং প্রতিদিন বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয় বলে নিরাপত্তা প্রয়োজন।
বিএনপি ও অন্যান্য দলের কয়েকজন সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থীও গানম্যান বা অস্ত্রের লাইসেন্স চেয়ে আবেদন করেছেন।
এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ঢালাওভাবে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, নতুন করে অস্ত্রের লাইসেন্স দিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। বরং কার ঝুঁকি কতটা—তা নিরূপণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা নিরাপত্তা দেওয়াই যুক্তিসংগত।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, অস্ত্রের অপব্যবহার রোধে যাচাই-বাছাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। নির্বাচন সামনে রেখে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলেও এ বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।