google-site-verification=EcdkQf27QgQiUVrz2fa6ZQxgrlewb0syaCf_Ho2k3TU
ছবির ক্যাপশন: গণভোটে সরকারের পক্ষ নেওয়া বৈধ ও নৈতিক, এটি জনগণের সম্মতির প্রক্রিয়া
গণভোটে সরকারের পক্ষ নেওয়া নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আইনি ও নৈতিক—দুই দিক থেকেই অমূলক বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার একটি গণ–অভ্যুত্থানের ফল এবং সংস্কার বাস্তবায়নই এই সরকারের মূল ম্যান্ডেট। সে কারণেই জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়ে জনগণের সম্মতি নেওয়ার দায়িত্ব সরকার এড়িয়ে যেতে পারে না।
প্রথম আলোর সঙ্গে এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে আলী রীয়াজ বলেন, সংবিধান, আরপিও কিংবা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন–সংক্রান্ত আদেশ—কোথাও গণভোটে সরকারের পক্ষ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা নেই। আন্তর্জাতিক উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে ব্রেক্সিট গণভোটসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকার প্রকাশ্যেই পক্ষ নিয়েছে। তাই এ নিয়ে বিভ্রান্তির সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, এই সরকার কোনো সংস্কার চাপিয়ে দিতে চায় না। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা, কমিশনগুলোর কাজ এবং জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি হয়েছে। এখন সেই সনদের ওপর জনগণের সম্মতি নেওয়ার জন্যই গণভোট। এটি কোনো একক দলের এজেন্ডা নয়; বরং ভবিষ্যৎ সরকারের জন্যও একটি নৈতিক দায়বদ্ধতা তৈরি করবে।
গণভোটে চারটি প্রশ্ন নিয়ে যে সমালোচনা উঠেছে, তা নাকচ করে আলী রীয়াজ বলেন, প্রকৃতপক্ষে প্রশ্ন একটি—চারটি বিষয়ের ওপর সম্মতি আছে কি না। সংবিধান একটি সমন্বিত দলিল, সেখানে বড় সংস্কারের ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা প্রশ্ন করা হয় না। কেনিয়া, তিউনিসিয়া, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের উদাহরণ এবং বাংলাদেশের অতীত গণভোটের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে কী হবে—এ প্রশ্নে আলী রীয়াজ বলেন, তিনি নেতিবাচক সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতেই চান না। তাঁর বিশ্বাস, জনগণের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা আছে এবং তারা ইতিবাচকভাবেই ভোট দেবে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যারা শুরুতে ‘না’ বলেছে, তারা শেষ পর্যন্ত ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
জুলাই সনদে সংসদকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করার যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা সংসদের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করবে—এমন অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে সীমিত আকারে সাংবিধানিক ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। এটি একটি ‘লিমিটেড কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার’, যা জনগণের সম্মতির ভিত্তিতেই দেওয়া হবে। এতে সংসদের ক্ষমতা কমবে না; বরং মৌলিক সংস্কারকে আইনি সুরক্ষা দেবে।
১৮০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনির্দিষ্টকাল সংস্কার ঝুলিয়ে রাখলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংস্কার শেষ করাই যুক্তিসংগত। ইতিমধ্যে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে দলিল তৈরি হওয়ায় সংস্কার বাস্তবায়ন দুরূহ হবে না বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়ে যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে—এমন প্রশ্নে আলী রীয়াজ বলেন, যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, জনগণের রায় অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়ন করা তাদের নৈতিক দায়িত্ব হবে। রাজনৈতিক দলগুলো তখন জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আলী রীয়াজ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংস্কার করার ইচ্ছা রয়েছে, যদিও মাত্রা ও পদ্ধতি নিয়ে মতপার্থক্য আছে। আলোচনার মধ্য দিয়ে সেই দূরত্ব অনেকটাই কমেছে। তাঁর মতে, অধিকাংশ দলই স্থিতাবস্থার রাজনীতি থেকে সরে এসেছে।
তবে নারী প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে তিনি হতাশা প্রকাশ করেন। জুলাই সনদ অনুযায়ী ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের অঙ্গীকার অনেক দল বাস্তবায়ন না করায় তিনি বলেন, এটি গণ–অভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকার প্রতি অবমূল্যায়নের শামিল এবং ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক নয়।
গণভোটে ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম হলে নৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে কি না—এমন প্রশ্নে আলী রীয়াজ বলেন, অতীত গণভোটেও ভোটার উপস্থিতি কম ছিল, তবু তার সিদ্ধান্ত বৈধ ছিল। সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের চরিত্র আলাদা, তাই ভোটের হার কমবেশি হওয়াই স্বাভাবিক।