google-site-verification=EcdkQf27QgQiUVrz2fa6ZQxgrlewb0syaCf_Ho2k3TU
ছবির ক্যাপশন: ইতিহাসের সর্বোচ্চ সোনার দাম: বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তায় নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছে বিনিয়োগকারীরা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প ‘মণিহারা’-তে মণিমালিকার মতোই আজও সোনার প্রতি মানুষের মোহ কমেনি। সময় যতই বদলাক, সোনা এখনো বিপদের সময়ের ভরসা, আবার সৌন্দর্যের অলংকারও বটে। তবে আজকের পৃথিবীতে এক ভরি সোনার দাম যখন ২ লাখ টাকার বেশি, তখন ভালোবাসা দিয়েও স্ত্রীকে সোনায় মুড়ে দেওয়া কঠিন!
৮ অক্টোবর বিশ্ববাজারে প্রথমবারের মতো সোনার দাম প্রতি আউন্স ৪ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়, আর ১৭ অক্টোবর তা নতুন রেকর্ড গড়ে ৪ হাজার ২০০ ডলারে পৌঁছায়। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও—এখন এক ভরি সোনার দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৬ হাজার ৩৩২ টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
বিনিয়োগকারীরা এখন সোনার দিকে ঝুঁকছেন নিরাপদ সম্পদ হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার কমার আশঙ্কা ও চীন–মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধের উত্তাপ এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়েছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ইতিহাসে সোনার দামের উল্লম্ফনের চারটি প্রধান সময় এসেছে—
১️⃣ ১৯৩০-এর মহামন্দা:
যুক্তরাষ্ট্রে শেয়ারবাজার ধসের পর শুরু হয় মহামন্দা। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট সোনার ব্যক্তিগত মালিকানা নিষিদ্ধ করেন, যা ডলারের মান প্রায় ৪০% কমিয়ে দেয়। এখান থেকেই শুরু হয় কাগুজে মুদ্রার যুগ।
২️⃣ ১৯৭০-এর দশক:
‘নিক্সন শক’-এর পর ডলারকে সোনা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। তেলের সংকট, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও মূল্যস্ফীতির কারণে ১৯৮০ সালে প্রতি আউন্স সোনার দাম বেড়ে পৌঁছে যায় ৮৫০ ডলারে—২৪০০% বৃদ্ধি!
৩️⃣ ২০০০-এর দশক:
‘ডটকম বাবল’ ধস ও ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দার সময় বিনিয়োগকারীরা আবার সোনায় আশ্রয় নেন। এক দশকে দাম বেড়ে যায় চারগুণ, প্রায় ১,২০০ ডলারে।
৪️⃣ ২০২০-এর কোভিড মহামারি:
বিশ্বজুড়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ ছাপানোর ফলে কাগুজে মুদ্রার মান কমে যায়। সোনা তখন পৌঁছে যায় ২ হাজার ডলারে, আর এখন ৪ হাজার ডলার ছাড়িয়ে চতুর্থ উত্থানকাল চলছে।
১️⃣ ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা: ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংঘাত ও বাণিজ্যযুদ্ধ বিনিয়োগকারীদের সোনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
২️⃣ মার্কিন রাজনৈতিক ঝুঁকি: ট্রাম্পের অস্থির নীতি ডলারের প্রতি আস্থা কমিয়েছে।
৩️⃣ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেকর্ড ক্রয়: ২০২২–২৪ সালে তারা কিনেছে ৩,২০০ টন সোনা।
৪️⃣ ডি-ডলারাইজেশন: ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে চীন, ভারত ও রাশিয়া।
৫️⃣ রিজার্ভ কাঠামোর বদল: কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভে এখন সোনার অংশ ২৭%।
৬️⃣ সুদের হার কমা: কম সুদের পরিবেশ সোনাকে আরও আকর্ষণীয় করছে।
৭️⃣ বৈশ্বিক ঋণের চাপ: যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ ৩৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
৮️⃣ মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা: সোনা সব সময়ই মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে ঢাল।
৯️⃣ ইটিএফ বিনিয়োগ: বিনিয়োগ ফান্ডের মাধ্যমে সোনায় অংশগ্রহণ দ্রুত বাড়ছে।
🔟 মানুষের ভয় ও মনস্তত্ত্ব: ‘সুযোগ হারানোর ভয়’ (FOMO) বাজারে সোনার চাহিদা বাড়াচ্ছে।
🔸 ইউবিএস মনে করছে, ২০২৬ সাল পর্যন্ত সোনার দাম ৪,২০০ ডলার পর্যন্ত থাকবে।
🔸 গোল্ডম্যান স্যাকস বলছে, ২০২৬ সালে দাম পৌঁছাতে পারে ৫,০০০ ডলারে।
🔸 ব্যাংক অব আমেরিকা গ্লোবাল রিসার্চ জানিয়েছে, গড় দাম হতে পারে ৪,৪০০ ডলার।
তবে অর্থনীতি স্থিতিশীল হলে বা ফেড সুদহার বাড়ালে দাম সাময়িকভাবে ১৫–২০% কমতেও পারে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্বল্পমেয়াদে দামে ওঠানামা হতে পারে, তবে দীর্ঘ মেয়াদে সোনা এখনো শক্তিশালী সম্পদ। ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ডলারের দুর্বলতা ও বিনিয়োগ বৈচিত্র্য সোনার চাহিদা টিকিয়ে রাখবে।
সুতরাং ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বলা যায়—
যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা আর ভয়ের যুগে মানুষ আজও মণিমালিকার মতো সোনাকেই সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় মনে করে।