google-site-verification=EcdkQf27QgQiUVrz2fa6ZQxgrlewb0syaCf_Ho2k3TU
ঢাকা | , ১২ মাঘ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

আপসহীন নেতৃত্বের অবসান: দেশনেত্রী খালেদা জিয়া ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অপূরণীয় শূন্যতা

Jashore Now
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Dec 31, 2025 ইং
ছবির ক্যাপশন: আপসহীন নেতৃত্বের অবসান: দেশনেত্রী খালেদা জিয়া ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অপূরণীয় শূন্যতা ছবির ক্যাপশন: আপসহীন নেতৃত্বের অবসান: দেশনেত্রী খালেদা জিয়া ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অপূরণীয় শূন্যতা
ad728

দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশ শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকেই হারাল না, হারাল সংগ্রাম, সাহস, অকৃত্রিম দেশপ্রেম, সততা ও নীতিনিষ্ঠতার এক অনন্য প্রতীককে। তাঁর প্রস্থান দেশের জনগণ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের জন্যও এক অপূরণীয় ক্ষতি, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। খালেদা জিয়াকে ছাড়া বাংলাদেশ কল্পনা করা অনেকের কাছেই কঠিন বাস্তবতা।

একটি বিশেষ রাজনৈতিক সংকটময় প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আগমন ঘটে। মূলত একজন গৃহবধূ হিসেবে সংসার ও সন্তান লালন-পালনেই সীমাবদ্ধ ছিল তাঁর জীবন। কিন্তু ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর দলের ঐক্য ও ভবিষ্যতের স্বার্থে তিনি রাজনীতিতে আসতে বাধ্য হন। স্বামীর মৃত্যুর সাত মাস পর তিনি বিএনপির সদস্য হন এবং সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন।

সে সময় দেশে চলছিল সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের স্বৈরতান্ত্রিক শাসন। সেই বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশেই খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে আপসহীন সংগ্রাম শুরু করেন। শুরুতে জনসভায় বক্তৃতার অভিজ্ঞতা না থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী বক্তায় পরিণত হন। ধীরে ধীরে তিনি একজন ক্যারিশমাটিক নেত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং সাধারণ মানুষের হৃদয়ে দৃঢ় স্থান করে নেন।

খালেদা জিয়া দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিলে স্বৈরশাসন বৈধতা পাবে। সে কারণেই তিনি এরশাদ আমলের কোনো নির্বাচনেই অংশ নেননি। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী অংশ নিলেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন।

তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে তৎকালীন সাতদলীয় জোট; শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আটদলীয় জোট এবং বামপন্থীদের পাঁচদলীয় জোটও এরশাদবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৯০ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও সামরিক বাহিনীর সমর্থন প্রত্যাহারের ফলে এরশাদের পতন ঘটে। এই পুরো সময়জুড়ে খালেদা জিয়া কোনো আপসের পথে হাঁটেননি, যার ফলে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে বিএনপি একক দল হিসেবে সর্বাধিক আসন লাভ করে, যা অনেকের কাছেই ছিল অপ্রত্যাশিত। ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছিল, আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। কিন্তু খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাই বিএনপির বিজয়ের প্রধান কারণ হয়ে ওঠে। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় জামায়াতের সমর্থনে সরকার গঠন করতে হয় বিএনপিকে। সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় হরতাল ও আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে চাপে রাখে। একপর্যায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি ওঠে। শুরুতে অনড় থাকলেও জনগণের আকাঙ্ক্ষা বিবেচনায় নিয়ে খালেদা জিয়া সেই দাবি মেনে নেন, যা তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বাস্তববোধের পরিচয় দেয়।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচন ছিল রাজনৈতিক বাস্তবতারই ফল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংসদে পাস করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ৩০ মার্চ খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে।

২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আবার ক্ষমতায় ফেরে। তবে এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতাই পরবর্তীতে নানা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটের জন্ম দেয়। ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়োগ নিয়ে সৃষ্ট সংকটের জেরে ১/১১-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপে খালেদা জিয়া ও তাঁর পরিবার ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার হন। দুই ছেলে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের মুখে পড়েন, আর খালেদা জিয়াকেও কারাবরণ করতে হয়। তবু তিনি বিদেশে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশই আমার শেষ ঠিকানা।’

পরবর্তীতে দুই ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে বাধ্য হলেও তিনি নিজে দেশে থেকে যান এবং প্রতিকূল পরিবেশেই ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেন। সেই নির্বাচনে বিএনপি বিরূপ পরিস্থিতির মুখে পড়ে পরাজিত হয়। এরপর দীর্ঘ ১৫ বছর দেশে বিরোধী দল দমন, গুম-খুন ও রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয় এবং তাঁকে দীর্ঘদিন কারাবন্দী ও পরে গৃহবন্দী অবস্থায় থাকতে হয়, যার ফলে তাঁর স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি ঘটে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর খালেদা জিয়া মুক্তি পান। গণতান্ত্রিক উত্তরণের অপেক্ষায় থাকা দেশের জন্য এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে তাঁকে শেষবার জনসমক্ষে দেখা যায়। এরপর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দুই দিনের মধ্যেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

নীতির প্রশ্নে ও দেশের স্বার্থে কখনো আপস না করা এই নেত্রীর প্রস্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করবে। সংকটকালে একজন অভিভাবকসুলভ নেতৃত্ব দেওয়ার যে সম্ভাবনা তাঁর মধ্যে ছিল, তা তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই ইতিহাসের পাতায় রয়ে গেল।
— ড. মাহবুবউল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ


নিউজটি পোস্ট করেছেন : Jashore Now

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ