জাতীয় ঐক্য ও সমঝোতার পরিবেশ সৃষ্টি করাই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে মন্তব্য করেছেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। তিনি বলেছেন, অতিরিক্ত বিরোধ, বিভেদ ও সংকট নিয়ে কোনো দেশ টেকসইভাবে চলতে পারে না, এমনকি কোনো সরকারও কার্যকরভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারে না।
রোববার দুপুরে রাজধানীর র্যাডিসন ব্লু হোটেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ‘ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ উপলক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক, টেলিভিশন ও রেডিওর বার্তাপ্রধান এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে এ সভার আয়োজন করে ‘তারেক রহমান–স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কমিটি’। সভায় সভাপতিত্ব করেন কমিটির আহ্বায়ক ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
মতিউর রহমান বলেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। তাঁর মতে, তারেক রহমান আরও আগে দেশে ফিরতে পারলে বিএনপি ও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। তিনি বলেন, তারেক রহমানের অনুপস্থিতি বিএনপির ভেতরে যেমন প্রশ্ন ও বিভ্রান্তি তৈরি করেছে, তেমনি সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিসরেও অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
আগামী দিনে যে দল সরকার গঠন করবে, তাদের জন্য সময়টি হবে বাংলাদেশের গত ৫০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন সময়—এমন মন্তব্য করে মতিউর রহমান বলেন, বিএনপির কাছ থেকে তিনি আরও বেশি সহনশীলতা ও সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা প্রত্যাশা করেন। বিভিন্ন জরিপের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, বিএনপি এখনো দেশের সবচেয়ে বড় দল হিসেবে বিবেচিত এবং নির্বাচনে বড় ব্যবধানে বিজয়ের সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে ক্ষমতায় আসতে যাওয়া দলের জন্য নেতৃত্বের আচরণ, বিনয় ও দায়িত্বশীলতা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বলে তিনি সতর্ক করেন।
তিনি আরও বলেন, বিএনপির প্রার্থী তালিকা নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে খুব বেশি উৎসাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। কিছু জায়গায় পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে কি না, তা ভেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে মতিউর রহমান বলেন, বিএনপির শাসনামলে গণমাধ্যম পুরোপুরি স্বস্তিতে ছিল—এমন দাবি তিনি করেন না। তবে তুলনামূলকভাবে সে সময়টি ছিল কিছুটা বেশি সহনশীল। বিপরীতে গত ১৫–১৬ বছরে স্বৈরাচারী শাসনামলে সংবাদপত্র শিল্প সবচেয়ে বেশি ভয় ও চাপের মধ্যে ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ভবিষ্যতে যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে, তাহলে শুধু সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না—বরং সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হবে একটি জাতীয় ঐক্য ও সমঝোতার পরিবেশ তৈরি করা, বলেন প্রথম আলো সম্পাদক। তিনি বলেন, এত বিভক্ত সমাজ নিয়ে কোনো দেশই সামনে এগোতে পারে না।
মতিউর রহমান আরও বলেন, এই সময়ে শুধু প্রথম আলো নয়, পুরো গণমাধ্যমই ভয়াবহ চাপের মুখে ছিল। অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত ভীতিকর। তিনি ডিজিএফআইসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সরাসরি হস্তক্ষেপ, মালিকানা বদল, সম্পাদক পরিবর্তন এবং শেয়ার হস্তান্তরের চেষ্টার কথাও তুলে ধরেন।
সরকার যদি সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক পথে অগ্রসর হতে চায়, তাহলে সংবাদপত্রের সমালোচনা শুনতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শুনবেন, জানবেন—মানবেন কি না, সেটা সরকারের সিদ্ধান্ত। কিন্তু না শুনলে ভুলের পুনরাবৃত্তি হবেই।’
মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য দেন যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, নোয়াব সভাপতি এ কে আজাদ, মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা। সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ দলটির শীর্ষ নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।