google-site-verification=EcdkQf27QgQiUVrz2fa6ZQxgrlewb0syaCf_Ho2k3TU
ঢাকা | , ১২ মাঘ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বাধা পেরিয়ে এগিয়ে চলা মেয়েরা: সাতক্ষীরার বুড়িগোয়ালিনীতে নারী ফুটবলের জয়যাত্রা

Jashore Now
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 29, 2025 ইং
ছবির ক্যাপশন: বাধা পেরিয়ে এগিয়ে চলা মেয়েরা: সাতক্ষীরার বুড়িগোয়ালিনীতে নারী ফুটবলের জয়যাত্রা ছবির ক্যাপশন: বাধা পেরিয়ে এগিয়ে চলা মেয়েরা: সাতক্ষীরার বুড়িগোয়ালিনীতে নারী ফুটবলের জয়যাত্রা
ad728

তখন বিকেল পাঁচটা। মৌসুমের পড়ন্ত আলোয় সাতক্ষীরার বুড়িগোয়ালিনীর প্রান্তরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে কমলা রঙের ঝিলিক। দূর থেকে দেখা যায়, মেয়েরা ফুটবল অনুশীলনে ব্যস্ত। পথ দেখানো ব্যক্তি আঙুল তুলে বললেন, “ওই যে মেয়েরা প্র্যাকটিস করছে।”

মেয়েরা যেখানে অনুশীলন করছে, সেটি শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের ৩৬ নম্বর আড়পাংগাশিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ। ছোট প্রাচীর ঘেরা সেই স্কুল মাঠে কমলা জার্সি পরা কিশোরীরা প্রাণপণে ফুটবলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেদিন ছিল ২২ সেপ্টেম্বর।


ফুটবলে নারীর লড়াই ও সাতক্ষীরার ব্যতিক্রম

দেশজুড়ে নারী ফুটবল নিয়ে এখনও নানা বাধা, কটূ কথা ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা বিরাজমান। জয়পুরহাট, রংপুর, খুলনা—সব জায়গাতেই নারী ফুটবল আয়োজন ঘিরে নানা বিতর্ক ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সাতক্ষীরা কিছুটা আলাদা।

এই জেলা দিয়েছে জাতীয় নারী ফুটবল দলের অধিনায়ক আফঈদা খন্দকার প্রান্তি, সাবিনা খাতুন এবং মাছুরা পারভীনের মতো তারকা। বুড়িগোয়ালিনীর সাথী মুন্ডাও এখন গর্বের নাম—যিনি নেপালে অনুষ্ঠিত ২০২৪ সাফ অনূর্ধ্ব–১৬ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে ফাইনালে জোড়া গোল করে বাংলাদেশকে জিতিয়েছেন।


অনুশীলনের মাঠে মেয়েদের দৃঢ়তা

২২ সেপ্টেম্বর বিকেলে বুড়িগোয়ালিনী যুব বেসিক ফুটবল একাডেমির কোচ মাসুম বিল্লাহ মেয়েদের ওয়ার্মআপ করাচ্ছিলেন। প্রিয়নাথ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মেয়েরা পরদিন আন্তস্কুল টুর্নামেন্টের ফাইনালের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বৃষ্টিতে কাদা জমে থাকা মাঠে বাঁশের গোলপোস্ট, জালবিহীন গোল—তবু উদ্দীপনায় ভরপুর মেয়েরা।

অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী প্রদীপ্তা রানী জানায়, “ফুটবল খেলতে খুব ভালোবাসি। মা–বাবা অনুপ্রেরণা দেন। অনেকে কটু কথা বলে, কিন্তু আমরা পাত্তা দিই না।”

তার সহপাঠী তিথি রানী ও আফরোজা আক্তারও একইভাবে পরিবারের সহযোগিতায় খেলছে। ষষ্ঠ শ্রেণির উজ্জয়িনী জোয়ার্দার বলল, “বাইরের লোকেরা বলত খেলা যাবে না। বাবা–মা বলেছেন, তুই তোর মতো খেল, তুই ভালো করলে তারাই একদিন তোর প্রশংসা করবে।”

২৩ সেপ্টেম্বরের ফাইনালে উজ্জয়িনীর দল ২–০ গোলে জয় পায়, দুটি গোলই তার।


সাফল্যে অনুপ্রাণিত হচ্ছে নতুন প্রজন্ম

কোচ মাসুম বিল্লাহ জানান, ইউনিয়নের ৫৮ জন মেয়ে ফুটবল প্রশিক্ষণ নিচ্ছে, যার মধ্যে ২৮ জন নিয়মিত। চারজন এখন ঢাকায় প্রথম বিভাগে খেলছে, আর গত বছর ১২ জন খেলেছে বিভাগীয় পর্যায়ে।

তিনি বলেন, “প্রথমে অনেকেই মেয়েদের ফুটবল নিয়ে আপত্তি করতেন, এখন তারাই উৎসাহ দিচ্ছেন। সাথী মুন্ডা গ্রামে এলে লোকজন ভিড় করে প্র্যাকটিস দেখতে আসে।”

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দেবাশীষ জোয়ার্দার বলেন, “এলাকার মা–বাবারাই মেয়েদের মাঠে নিয়ে আসেন। তাদের আগ্রহ সত্যিই প্রশংসনীয়।”

উজ্জয়িনীর বাবা বিধান কুমার জোয়ার্দার বলেন, “মেয়ে ছোটবেলা থেকেই ফুটবল ভালোবাসে। আমরা ওকে বাধা দিইনি। বরং চাই, ফুটবলই ওর পেশা হোক।”


প্রয়োজন অবকাঠামো ও সহায়তার

কোচ মাসুম বিল্লাহ জানান, ‘স্পোর্টস ফর হোপ অ্যান্ড ইনডিপেনডেন্স বাংলাদেশ’ নামে একটি সংস্থা কিছু সরঞ্জাম ও অর্থ সহায়তা দিয়েছে। তবে মাঠের অভাব, যাতায়াত খরচ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় অনেক মেয়ে নিয়মিত অনুশীলনে আসতে পারে না।

তিনি বলেন, “একবেলা মোটরসাইকেল চালাই, একবেলা ফ্রিতে ফুটবল শেখাই। ভালো মাঠ ও সামান্য সহায়তা পেলে এখানকার মেয়েরা জাতীয় পর্যায়ে আরও বড় সাফল্য আনতে পারবে।”

শিক্ষক দেবাশীষ জোয়ার্দার যোগ করেন, “সহায়তা পেলে এই মেয়েরাই একদিন দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।”


উপসংহার:
বুড়িগোয়ালিনীর কাদামাখা মাঠে অনুশীলনরত মেয়েদের চোখে একটাই স্বপ্ন—ফুটবল মাঠে দেশের পতাকা উড়ানো। বাধা আছে, কটু কথা আছে, তবু এগিয়ে চলার অদম্য সাহসই তাদের শক্তি। সাতক্ষীরার এই মেয়েরা প্রমাণ করছে—ইচ্ছাশক্তির কাছে সমাজের বাঁধা কখনোই শেষ কথা নয়।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : Jashore Now

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ