গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী সোমবার ঐতিহাসিক বন্দিবিনিময় সম্পন্ন করেছে হামাস ও ইসরায়েল। জীবিত জিম্মিদের হাতে তুলে দিয়েছে হামাস, আর মৃতদের মরদেহও ফেরত দেওয়া শুরু হয়েছে। পাল্টা হিসেবে ইসরায়েলও ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তির ঘোষণা দেয়।
একই দিনে মধ্যপ্রাচ্যে সফরে আসেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে ভাষণ দিতে গিয়ে ‘জেনোসাইড’ লেখা পোস্টার উঁচিয়ে ধরেন এক আইনপ্রণেতা, এতে সংসদে হট্টগোল বাধে এবং কিছু সময়ের জন্য ভাষণ বন্ধ থাকে।
⚖️ বন্দিবিনিময় সম্পন্ন, ফিরলেন জীবিত জিম্মিরা
আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা রেডক্রসের তত্ত্বাবধানে দুই ধাপে হামাস জীবিত ২০ জন জিম্মিকে ইসরায়েলের হাতে তুলে দেয়। এ ছাড়া নিহত ৪ জন জিম্মির মরদেহও ফেরত দেয় তারা।
এর জবাবে ইসরায়েল সোমবার রাতে ১,৯৬৮ ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দেয়। ওফের ও কেতজিওত কারাগার থেকে মুক্ত বন্দীদের পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও কেরেম সালোমে নেওয়া হয়।
মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনিদের স্বাগত জানাতে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন। অনেকের হাতে ছিল ফিলিস্তিনের পতাকা, মুখে স্বাধীনতার স্লোগান।
গাজার খান ইউনিসে পতাকা আর ব্যানারে সাজানো হয় আনন্দ মিছিলের আয়োজন। দুই বছর পর ছেলেকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত ইয়াসির আবু আজুম বলেন,
“২০২৩ সালে ছেলেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আজ আমি তাকে আবার দেখতে পারছি—এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।”
💔 ইসরায়েলি কারাগারে নির্যাতনের অভিযোগ
মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনি সাংবাদিক আলা–রিমায়ি জানান, কারাগারে অনাহার ও শারীরিক নির্যাতন ছিল ভয়াবহ। তাঁর ওজন কমেছে ৫০ কেজির বেশি।
“মুক্তি পেয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরতেই সে বলল, ‘বাবা, তুমি আমাকে ব্যথা দিচ্ছ।’ আমার শরীর থেকে হাড় বেরিয়ে এসেছে।”
বিরজেইত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বাসিল ফারাজ বলেন, বন্দী মুক্তি মানেই ইসরায়েল নির্যাতন বন্ধ করবে না। বরং ২০২৩ সালের পর থেকে নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়েছে।
🗣️ নেসেটে ট্রাম্পের ভাষণে উত্তেজনা
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে ভাষণ দিতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্যে বাধা দেন দুই আইনপ্রণেতা। আয়মান ওদেহ ও ওফের কাসাইফ ‘ফিলিস্তিনের মুক্তি চাই’ ও ‘জেনোসাইড’ লেখা কাগজ তুলে ধরেন। পরে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তাঁদের পার্লামেন্ট থেকে সরিয়ে নেন।
ভাষণে ট্রাম্প বলেন,
“আকাশ এখন শান্ত, বন্দুক নীরব। পবিত্র ভূমিতে অবশেষে শান্তি ফিরছে।”
তিনি হামলা বন্ধে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে এবং মধ্যস্থতায় ভূমিকা রাখায় আরব দেশগুলোকে ধন্যবাদ জানান।
🌍 শারম আল–শেখে শান্তি সম্মেলন
নেসেটে ভাষণ শেষে ট্রাম্প মিসরের শারম আল–শেখে আয়োজিত ‘শান্তি সম্মেলন ২০২৫’-এ যোগ দেন। সম্মেলনে গাজা যুদ্ধবিরতি টেকসই করতে ২৮ দেশের বিশ্বনেতা অংশ নেন।
উপস্থিত ছিলেন—
-
মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল–সিসি
-
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান
-
কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি
-
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার
-
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ
-
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্ৎস
-
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, প্রমুখ।
সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন,
“আমরা যা অর্জন করেছি, তা ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায় হয়ে থাকবে। এই যুদ্ধবিরতি বিশ্ব চিরকাল মনে রাখবে।”
🕊️ উপসংহার
দুই বছর রক্তপাতের পর গাজায় শুরু হলো নতুন এক অধ্যায়—শান্তির সূর্যোদয়। যদিও বন্দিবিনিময় ও যুদ্ধবিরতি চুক্তি এখনো নাজুক, তবু মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এটি এক বিরল মুহূর্ত—যেখানে রক্তের বদলে প্রথমবার উঠে এসেছে আশার আলো।