বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক নতুন সময়ের মুখে দাঁড়িয়ে। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের পতন দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এনেছে। দীর্ঘদিনের দলীয়করণ, প্রশাসনিক পক্ষপাত ও ক্ষমতার একচেটিয়া ব্যবহারের পতনের পর এখন রাজনীতিতে নতুন বিন্যাস ও ভাবনার সূচনা ঘটছে।
এই পরিবর্তনের মধ্যেই বিএনপি ইঙ্গিত দিচ্ছে এক ভিন্নধারার “নীতি–ভিত্তিক রাজনীতি”র। দলটি শুধু ক্ষমতায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে না, বরং দেশ পরিচালনার একটি নতুন দর্শনও তুলে ধরছে—যেখানে গুরুত্ব পাচ্ছে পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও টেকসই উন্নয়ন।
সংস্কার ও ঐকমত্যের রাজনীতি
রাজনৈতিক বিভেদের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও এখন বিভিন্ন দলের মধ্যে ঐকমত্য তৈরির প্রচেষ্টা বাড়ছে। বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন, মিডিয়া সংস্কার, উচ্চকক্ষ প্রবর্তন এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমা নির্ধারণ—এসব বিষয়ে দলগুলো আলোচনার মাধ্যমে অভিন্ন অবস্থানে আসছে।
এই ঐকমত্য গঠনে বিএনপির ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। কারণ, ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনাময় দল হিসেবে তারা শুধু প্রস্তাবই দিচ্ছে না, বাস্তবায়নের দায়িত্বও গ্রহণে প্রস্তুত।
তারেক রহমানের নীতি–কেন্দ্রিক বার্তা
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বিবিসি বাংলা সাক্ষাৎকার ও অন্যান্য বক্তব্যে উঠে এসেছে নীতি–ভিত্তিক রাজনীতির আহ্বান। তিনি জোর দিচ্ছেন সহিংসতা ও পেশিশক্তির রাজনীতি বাদ দিয়ে আদর্শ ও নীতির ভিত্তিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর।
তার নেতৃত্বে গঠিত বিশেষজ্ঞ দল ইতিমধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, কৃষি, সুনীল অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান বিষয়ে বিস্তারিত নীতি পরিকল্পনা তৈরি করেছে। শুধু প্রতিশ্রুতির তালিকা নয়, বরং এসব পরিকল্পনায় “কীভাবে বাস্তবায়ন হবে” তারও স্পষ্ট রূপরেখা দেওয়া হচ্ছে।
উন্নয়নের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
বিএনপির প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, নদী পুনরুদ্ধার, ২৫ কোটি গাছ রোপণ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নের মতো কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব উদ্যোগে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
দলটির এই দৃষ্টিভঙ্গি মেগা প্রজেক্টের পরিবর্তে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের দিকে নজর দিচ্ছে—যেখানে উন্নয়ন হবে সবার জন্য, কেবল নির্দিষ্ট শ্রেণি বা গোষ্ঠীর জন্য নয়।
নীতির প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন যুগ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস দীর্ঘদিন সহিংসতা, দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার লড়াইয়ে আবদ্ধ ছিল। এখন সেই রাজনীতিকে যদি নীতিনির্ভর ও জনগণকেন্দ্রিক করা যায়, তবে গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিকভাবে নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।
বিএনপি যদি এই নীতি–ভিত্তিক রাজনীতিকে টিকিয়ে রাখতে পারে এবং অন্য দলগুলোও নিজেদের নীতি স্পষ্টভাবে জনগণের সামনে উপস্থাপন করে, তবে বাংলাদেশও হয়তো বিশ্বে উন্নত গণতন্ত্রগুলোর মতো “নীতির প্রতিদ্বন্দ্বিতার রাজনীতি”তে প্রবেশ করতে পারবে।
বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন যাত্রা—শক্তির নয়, নীতির প্রতিযোগিতায়।