google-site-verification=EcdkQf27QgQiUVrz2fa6ZQxgrlewb0syaCf_Ho2k3TU
ছবির ক্যাপশন: রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশ গঠনে কমিশন, কিন্তু কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
পুলিশ বাহিনীতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মূল ক্ষেত্র হলো নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন। এই তিনটি জায়গায় অযাচিত হস্তক্ষেপের প্রভাব পড়ে পুলিশের স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও জনবিশ্বাসে। বহুদিন ধরে পুলিশ বাহিনী দাবি করে আসছিল কার্যকর স্বায়ত্তশাসন (Functional Autonomy)—যাতে বাহিনীর কার্যক্রম রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকে। তবে বাস্তবে সেই দাবি এখনো উপেক্ষিতই রয়ে গেছে।
জুলাই মাসে গণ–অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের নির্বিচার গুলি ও বলপ্রয়োগের পর থেকে বিভিন্ন মহলে দাবি ওঠে—পুলিশকে স্বাধীন কমিশনের অধীনে আনা হোক।
পুলিশের প্রস্তাব ছিল, এমন একটি স্বশাসিত কমিশন, যা ঊর্ধ্বতন পদে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি নিয়ন্ত্রণ করবে, পাশাপাশি নাগরিক অভিযোগ নিষ্পত্তি ও অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ নিরসনেও ভূমিকা রাখবে।
এই দাবির পর সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে পুলিশ কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেয়। আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলের নেতৃত্বে একটি উপদেষ্টা কমিটি কমিশনের খসড়া কাঠামো তৈরি করেছে।
খসড়া অনুযায়ী, কমিশনের নেতৃত্বে থাকবেন আপিল বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, আর সদস্যসচিব হবেন সাবেক একজন আইজিপি।
মোট ৯ সদস্যের এই কমিশনের মধ্যে সাতজন হবেন স্থায়ী এবং দুজন সংসদনেতা ও বিরোধীদলীয় নেতার মনোনীত প্রতিনিধি।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির এখতিয়ার কমিশনের হাতে দেওয়া হয়নি।
এসব এখনো থাকবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে। কমিশনের ভূমিকা সীমিত থাকবে নীতিমালা প্রণয়ন ও সুপারিশ প্রদান পর্যন্ত।
এর ফলে কমিশনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—যেহেতু তাদের সুপারিশ বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা নেই।
কমিশনের সদস্য নির্বাচনের জন্য গঠিত পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটির সভাপতি হবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা উপদেষ্টা।
অন্য সদস্যরা হবেন—
প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি,
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান,
সংসদের স্বরাষ্ট্র–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি,
এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান।
এই কাঠামোতে ক্ষমতাসীন সরকারের প্রভাব বজায় থাকবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
খসড়া অনুযায়ী, কমিশনের কাজ মূলত নীতিমালা প্রণয়ন, নির্দেশনা ও সুপারিশ প্রদান।
তাদের হাতে বাস্তবায়নের ক্ষমতা নেই। তারা পুলিশের নিয়োগ-পদোন্নতি নীতিমালা, আইজিপি নিয়োগে প্যানেল প্রস্তাব, এবং পুলিশের দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা নিয়ে কৌশলগত পরামর্শ দেবে।
কমিশন তিনজন অতিরিক্ত আইজিপির প্যানেল তৈরি করে সরকারের কাছে আইজিপি নিয়োগের সুপারিশ করবে, যার মেয়াদ দুই থেকে তিন বছর হতে পারে।
প্রস্তাবিত কমিশন পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে নাগরিক অভিযোগ অনুসন্ধান ও নিষ্পত্তি করবে।
এ ছাড়া পুলিশ সদস্যদের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ ও বৈষম্য, পদায়ন, শাস্তি বা হয়রানি–সংক্রান্ত অভিযোগ পর্যালোচনা ও সমাধানে পদক্ষেপ নেবে।
অভিযোগকারীর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে এসব পর্যালোচনা করবে কমিশন।
সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন,
“অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের এক বছর পরও স্বাধীন পুলিশ কমিশন বাস্তবায়িত না হওয়া সরকারের আন্তরিকতার ঘাটতি নির্দেশ করে।”
তিনি আরও বলেন,
“নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নের মতো মূল সমস্যাগুলো অপরিবর্তিত রেখে কমিশন গঠন করলে এর কোনো বাস্তব প্রভাব পড়বে না। ফাংশনাল অটোনমি না থাকলে পুলিশকে আগের মতোই রাজনৈতিক নির্দেশ মানতে হবে।”
প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশন গঠনের মাধ্যমে সরকারের একটি কাঠামোগত উদ্যোগ দেখা গেলেও,
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন—নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতার মূল জায়গাগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতে থেকে গেলে এই কমিশন বাস্তবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশ গঠনে কার্যকর হবে না।