google-site-verification=EcdkQf27QgQiUVrz2fa6ZQxgrlewb0syaCf_Ho2k3TU
ছবির ক্যাপশন: ৭২ বছর পর উদঘাটিত রহস্য: বিপ্লবী ইলা মিত্রের সেই ঐতিহাসিক ছবির আলোকচিত্রী ছিলেন মোশাররফ হোসেন লাল
কিশোরীবেলা থেকেই বাবার তোলা একটি ছবি খুঁজে ফিরছিলেন সাউথ পয়েন্ট স্কুলের শিক্ষক লায়লা মোশাররফ তুলি। তাঁর বাবা ছিলেন বাংলাদেশের ফটোসাংবাদিকতার অগ্রদূত মোশাররফ হোসেন লাল (১৯২৯–২০০৪)।
তুলি ছোটবেলা থেকেই বাবার মুখে শুনতেন এক ঐতিহাসিক আলোকচিত্রের গল্প—বন্দী অবস্থায় হাসপাতালে শায়িত বিপ্লবী কৃষক নেত্রী ইলা মিত্রের ছবি। কিন্তু ছবিটি কোথায়, কেউ জানত না।
ভিকারুননিসা নূন স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তুলি বাবার কাছে শুনতেন ইলা মিত্রের সেই ছবির কাহিনি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ার সময়ও বহু শিক্ষক ও সিনিয়রের কাছে খোঁজ নেন—কিন্তু ছবিটি কোথাও মেলেনি।
বছর গড়িয়ে যায়।
২০২২ সালে তুলি তাঁর অসুস্থ মেয়ে ওয়াহিদা রহমানকে নিয়ে আগারগাঁওয়ের নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রতিদিন বিকেলে মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালের বারান্দায় হাঁটতেন—সেখান থেকে দেখা যেত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। মেয়ে বলেছিল, “আম্মু, একদিন ওখানে যাব।”
সুস্থ হওয়ার পর তাঁরা গেলেন জাদুঘরে।
জাদুঘরের তৃতীয় তলার প্রথম গ্যালারিতে ঢুকেই তুলি দেখে অবাক হয়ে যান—দেয়ালে টানানো ইলা মিত্রের সেই ছবিটি!
বন্দী অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের বেডে শায়িত নেত্রী, চারপাশে শ্রদ্ধাভরে দাঁড়িয়ে আছেন সেবিকারা।
ছবির ক্যাপশনে লেখা—
“মুসলিম লীগ সরকারের চরম নির্যাতনের শিকার কৃষক নেত্রী ইলা মিত্র হয়ে উঠেছিলেন বাঙালি জাতির প্রতিরোধ চেতনার প্রতীক।”
ছবির দাতা হিসেবে লেখা ছিল রণেন মিত্র—ইলা মিত্রের ছেলে।
তুলি ছবিটি দেখে শিহরিত হন, সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ করেন জাদুঘরের কিউরেটর আমেনা খাতুনের সঙ্গে। তিনি জানান, জাদুঘরে ছবির মূল নেগেটিভ নেই—তারা পত্রিকায় ছাপা একটি স্ক্যান কপিই পেয়েছেন রণেন মিত্রের কাছ থেকে।
বাবার তোলা ছবি নিশ্চিত হওয়ার আনন্দে কেঁদে ফেলেন তুলি। এরপর তিনি যোগাযোগ করেন সাংবাদিকদের সঙ্গে।
একজন অনুসন্ধানে গিয়ে ২০০০ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার একটি পুরোনো প্রতিবেদন খুঁজে পান—
“কেমন আছেন আলোকচিত্রের দুই জাদুকর—মোজাম্মিল আর লাল ভাই”, আশীষ-উর–রহমান শুভের লেখা।
সেখানে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল:
“কারাগারে বন্দী ইলা মিত্র অসুস্থ হলে কড়া প্রহরায় ঢাকা মেডিকেল কলেজে আনা হয় তাঁকে। মোশাররফ হোসেন লাল ক্যামেরা লুকিয়ে ছদ্মবেশে গিয়ে তাঁর ছবি তোলেন। ছবিটি পরে ভারতের দ্য স্টেটসম্যান–এ ছাপা হয়।”
১৯৫৩ সালের নভেম্বর। ২৪ বছর বয়সী লাল ভাই তখন তরুণ সংবাদচিত্রী। শুনলেন, ইলা মিত্রকে অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়েছে।
প্রথম দিন তিনি ক্যামেরা ছাড়াই গিয়েছিলেন পরিস্থিতি দেখতে। এরপর দ্বিতীয়বার গেলেন প্রস্তুতি নিয়ে।
সোয়েটারের ভেতর ক্যামেরা লুকিয়ে, তার ওপর কোট পরে হাসপাতালে প্রবেশ করেন। নার্সরা তাঁকে “ডাক্তার” পরিচয়ে ভেতরে প্রবেশ করান।
গেটে থাকা পুলিশকে ব্যস্ত রাখেন দুই নার্স, আর চারজন ইলা মিত্রের বিছানার পাশে দাঁড়ান।
সেই মুহূর্তেই লাল ভাই বুকের ভেতর লুকানো ক্যামেরায় তিন–চারটি শট নেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই কাজ শেষ।
কেউ টেরও পায়নি।
ছবিটি প্রথম প্রকাশিত হয় ভারতের বিখ্যাত দৈনিক The Statesman–এ, কোনো ক্রেডিট ছাড়াই—আলোকচিত্রীর নিরাপত্তার কথা ভেবে।
ছবি প্রকাশের পর ভারত ও পাকিস্তানজুড়ে তোলপাড় পড়ে যায়।
ইলা মিত্রের পক্ষে জনমত জোয়ারে ভাসে দুই দেশই। মওলানা ভাসানীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা তাঁর মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হন।
অবশেষে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এলে মুক্তি পান ইলা মিত্র।
১৯৭৫ সালে সরকার যখন অধিকাংশ পত্রিকা বন্ধ করে দেয়, লাল ভাই তখন ভোলায় ঘূর্ণিঝড় কাভার করছিলেন। ঢাকায় ফিরে এসে দেখেন—তাঁর সব নেগেটিভ ও সংগ্রহ চুরি গেছে।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেই ছবির কোনো কপি আর বাঁচেনি।
দীর্ঘ সাত দশক পর অবশেষে জানা গেল, বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সাহসী আলোকচিত্রটি তুলেছিলেন মোশাররফ হোসেন লাল।
মেয়ে লায়লা মোশাররফ তুলির অক্লান্ত অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো এক বিস্মৃত অধ্যায়—যে ছবি একসময় পুরো উপমহাদেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।