দেশের বাইরে আমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য রপ্তানি করে গ্লোবাল ট্রেড লিংক নামের প্রতিষ্ঠানটি। এ বছর ইউরোপের তিন দেশে প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ৩৫ টন আম রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের তুলনায় ২০ টন কম। ২০২৪ সালে তারা সাত দেশে ৫৫ টন আম পাঠিয়েছিল, আর ২০২৩ সালে ছিল ৭৫ টন—এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রপ্তানির রেকর্ড।
গ্লোবাল ট্রেড লিংকের স্বত্বাধিকারী রাজিয়া সুলতানা বলেন, “এবার আমের উৎপাদন অনেক বেশি ছিল। কিন্তু রপ্তানি হলো অনেক কম। এতে আমি হতাশ।”
রপ্তানির লক্ষ্যে ভাটা
ব্যবসায়ীরা জানান, এবার আম রপ্তানির লক্ষ্য ছিল আগের বছরের চেয়ে বেশি। বিশেষ করে চীনে বিপুল পরিমাণ আম রপ্তানির আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে চীনে গেছে মাত্র ৫ টন আম।
রপ্তানিকারকদের মতে, উড়োজাহাজের অতিরিক্ত ভাড়া ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে রপ্তানির পরিমাণ কমে গেছে। তাছাড়া, চীনে রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠানকে, যা প্রতিযোগিতার সুযোগ কমিয়েছে।
রপ্তানির পরিসংখ্যান
কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ২ হাজার ১৮৮ টন আম রপ্তানি হয়েছে। গত বছর ছিল ১ হাজার ৩২১ টন, তবে ২০২৩ সালের ৩ হাজার ১০০ টন রপ্তানির তুলনায় তা অনেক কম।
রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০২৪ সালে রপ্তানি কমেছিল। কিন্তু এ বছর পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলেও রপ্তানিতে উন্নতি হয়নি।
বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্ট এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোবাশ্বেরুর রহমান বলেন,
“এবার এক কেজি আম রপ্তানি করতে অন্তত ৫০০ টাকা খরচ হয়েছে, যেখানে দুই বছর আগে লাগত ৩০০–৩৫০ টাকা।”
প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে
রপ্তানিকারকদের অভিযোগ, ভারত, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ডের তুলনায় বাংলাদেশের আমের দাম কেজিতে অন্তত ১ ডলার বেশি পড়ে। পাশাপাশি রপ্তানি প্রক্রিয়াও অত্যন্ত জটিল—প্রায় ৬০–৭০টি কাগজে সই করতে হয়, উড়োজাহাজের বুকিং পেতেও দিতে হয় “অতিরিক্ত ব্যয়”।
চীনে রপ্তানিতে হতাশা
কৃষিসচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ান এ বছর ঘোষণা দিয়েছিলেন, অন্তত ৫০ মেট্রিক টন আম চীনে রপ্তানি হবে। কিন্তু বাস্তবে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৫ টন, সেটিও শুধুমাত্র মেরিডিয়ান অ্যাগ্রো নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।
শ্যামপুরের কেন্দ্রীয় প্যাকেজিং হাউসের উপপরিচালক আমিনুর রশিদ বলেন,
“যদি একাধিক প্রতিষ্ঠান চীনে রপ্তানির সুযোগ পেত, প্রতিযোগিতা থাকত এবং পণ্যের মানও উন্নত হতো।”
অ্যাভোর ডি অ্যাপেটাইটের পরিচালক রেজাউল ইসলাম বলেন,
“একাধিক প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দিলে চীনের বাজারে এবার এত হতাশ হতে হতো না।”
ইউরোপ বনাম চীন
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, চীনে এক কেজি আম বিক্রি করে পাওয়া যায় ৭১ টাকা, যেখানে ইউরোপে একই আম বিক্রি হয় ২ ডলার (প্রায় ২৪০ টাকা) দামে। ফলে রপ্তানিকারকেরা চীনের পরিবর্তে ইউরোপের দিকেই বেশি আগ্রহী।
অনুমোদনের সীমাবদ্ধতা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক আরিফুর রহমান জানান, মেরিডিয়ান অ্যাগ্রো ছাড়া আর কেউ চীনে রপ্তানির অনুমতি পায়নি, কারণ অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
তবে রপ্তানিকারকেরা অভিযোগ করেন, সরকারি উদ্যোগের ঘাটতির কারণেই রপ্তানির ক্ষেত্র বাড়ানো যায়নি। একজন রপ্তানিকারক বলেন,
“আমরা যদি ইউরোপ ও আমেরিকায় আম পাঠাতে পারি, তবে চীনে কেন পারব না?”
– প্রতিবেদক: প্রথম আলো অনুপ্রেরণায় পুনর্লিখিত সংবাদ