google-site-verification=EcdkQf27QgQiUVrz2fa6ZQxgrlewb0syaCf_Ho2k3TU
ছবির ক্যাপশন: যমুনার পর পদ্মা–মেঘনায়ও ডিজেল ‘গায়েব’—দুই ডিপোতে দেড় লাখ লিটার ঘাটতি
যমুনা অয়েলের পর এবার পদ্মা ও মেঘনা তেল কোম্পানির ডিপোতেও ডিজেলের ঘাটতি ধরা পড়েছে। দুই প্রতিষ্ঠানের নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপোতে চট্টগ্রাম থেকে পাইপলাইনে সরবরাহ করা ডিজেলের হিসাব মিলছে না। সর্বমোট প্রায় দেড় লাখ লিটার ডিজেল ‘গায়েব’ হওয়ার ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সরকারি জ্বালানি তেল আমদানি–বিপণন সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সূত্র জানায়, পাইপলাইনে তেল সরবরাহের পর মজুত ট্যাংকে মাপার সময় ব্যাপক পার্থক্য পাওয়া গেছে। এখন দেখা হচ্ছে—পাইপলাইনের দুই প্রান্তের মিটার, ট্যাংকের সক্ষমতা কিংবা শীতকালীন তাপমাত্রাজনিত ঘনত্ব পরিবর্তন–—কোনো কারণে এই ঘাটতি দেখা দিয়েছে কি না।
ডিপো–সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, ডিপোতে এখনো সনাতনী পদ্ধতিতে রড (ডিপ স্টিক) দিয়ে ট্যাংকের গভীরতা মেপে তেলের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। গভীরতা মাত্র দুই মিলিমিটার কম দেখালেই ১ হাজার ১৮০ লিটার পর্যন্ত তেল চুরি করার সুযোগ থাকে। যমুনা অয়েলের পূর্বের ঘটনার মতো ট্যাংকের সক্ষমতা কম দেখানোর কারণে হিসাব গরমিলের নজিরও রয়েছে।
১০ নভেম্বর পাইপলাইনে চট্টগ্রাম থেকে মেঘনা পেট্রোলিয়াম ডিপোতে ২৫ লাখ ৩৭ হাজার ৭২৪ লিটার ডিজেল পাঠানো হয়। কিন্তু মেপে পাওয়া গেছে ২৪ লাখ ২২ হাজার ৪৭৩ লিটার—যা ১ লাখ ১৫ হাজার ২৫১ লিটার কম। পাইপলাইনে ক্ষতি হওয়ার কথা নয়, তবুও সাড়ে ৪ শতাংশের বেশি ঘাটতি দেখা গেছে।
মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহীরুল হাসান বলেন, পাইপলাইনে এখনো পরীক্ষামূলকভাবে তেল সরবরাহ চলছে। মিটার বা ট্যাংকের সক্ষমতায় সমস্যা থাকতে পারে। শীতের কারণে তেলের ঘনত্ব কমলেও প্রভাব পড়ে। বিষয়গুলো যাচাই করা হচ্ছে।
১১ নভেম্বর চট্টগ্রাম থেকে ২৫ লাখ ২০ হাজার ৭৭০ লিটার ডিজেল পাঠানো হয় পদ্মা অয়েলের গোদনাইল ডিপোতে। মেপে পাওয়া গেছে ২৪ লাখ ৯৩ হাজার ৪৬৮ লিটার—ঘাটতি ২৭ হাজার ৩০২ লিটার।
তবে পদ্মা অয়েল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান দাবি করেন, পাইপলাইনের দুই প্রান্তের মিটারের হিসাব অনুযায়ী ১ হাজার ৮০০ লিটার তেল বাড়তি রয়েছে। শীতের কারণে ট্যাংকে মাপার সময় কম দেখাতে পারে। নিয়মিত সরবরাহ শুরু হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
চট্টগ্রাম–ঢাকা পাইপলাইন প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১৬ সালে, শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালে। তিন দফা মেয়াদ বাড়িয়ে কাজ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের মার্চে। ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা। এখনো প্রকল্পের অধীনেই পাইপলাইন পরিচালিত হচ্ছে।
বিপিসি চেয়ারম্যান মো. আমিন উল আহসান বলেন, পাইপলাইন বুঝিয়ে দেওয়ার আগে দুই পাশের মিটার ও ডিপোগুলোর ট্যাংকের সক্ষমতা যাচাই করা হবে। এক–দেড় মাস লাগতে পারে। তিনি দাবি করেন, তেল গায়েব হওয়ার সুযোগ নেই—যেখানে ঘাটতি দেখা গেছে, তেল সেখানকার কোনো না কোনো অংশে রয়েই গেছে।
গত সেপ্টেম্বরে যমুনা অয়েল কোম্পানির ফতুল্লা ডিপোতে প্রায় সাড়ে তিন লাখ লিটার তেল ঘাটতির অভিযোগ ওঠে। তদন্ত কমিটি ট্যাংক দুটির সক্ষমতা পুনর্নির্ধারণ করে দেখে, আগের চার্টের তুলনায় মিলে ৭৭ হাজার ৪৯২ লিটার ধারণক্ষমতা বাড়তি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ শুরুতেই সক্ষমতা কম দেখিয়ে গরমিলের সুযোগ রাখা হয়েছিল।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, জাহাজ থেকে পেট্রলপাম্প পর্যন্ত তেল চুরি হওয়া নতুন কিছু নয়। চুরি ঠেকাতে পাইপলাইন করা হয়েছিল—সেখানেও গায়েব হওয়া অস্বাভাবিক। যাঁরা ট্যাংকের সক্ষমতা কম দেখিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন—এ প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। তাঁর মতে, স্বার্থ–সংঘাতমুক্ত নাগরিক বা আদালতের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করা জরুরি।
সর্বশেষ, জ্বালানি বিভাগ সাম্প্রতিক চুরি–গরমিলের ঘটনায় নজরদারি বাড়াতে নতুন কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে—যা কারিগরি ও অপারেশনজনিত বিষয় মূল্যায়ন করে সুপারিশ দেবে।