বরিশাল শহরের লঞ্চঘাটের পাশের পুরোনো খেয়াঘাট দিয়ে প্রতিদিনই কীর্তনখোলা নদীর এপার–ওপার মানুষজন যাতায়াত করেন। খেয়ানৌকার ভাড়া মাত্র পাঁচ টাকা, প্রতি যাত্রায় নেয় সর্বোচ্চ ১৪ জন যাত্রী। ২০ নভেম্বর সকালে এই ঘাটেই দেখা মিলল ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানো এক নারী—হেলেনা।
বরিশাল শহরে নারী রিকশাচালক দেখা যায় খুব কম, তাই কীর্তনখোলার ওপারে চরকাউয়ায় তাঁকে দেখে কৌতূহল বাড়ল। পরে খেয়াঘাট থেকে লাহারহাট যাওয়ার জন্য পরিবহন খুঁজতে গিয়ে আবার তাঁর মুখোমুখি হতে হলো। প্রবীণ এক দোকানদারের সহায়তায় ১২০ টাকায় ভাড়া ঠিক করে উঠে বসা হলো হেলেনার চালানো পুরোনো রিকশায়।
মাত্র দুই দিনের অভিজ্ঞতা নিয়েই রিকশা চালাচ্ছেন হেলেনা। এর আগে রাজমিস্ত্রির জোগালি হিসেবে দিনে ৭০০ টাকা আয় করতেন। কঠোর পরিশ্রম ও শারীরিক কষ্টের কারণে সে কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। এখন ভাড়া নেওয়া ব্যাটারিচালিত রিকশা চালান, যার দৈনিক জমা ৩০০ টাকা। জমা পরিশোধের পর হাতে থাকে ২০০–৩০০ টাকা।
হেলেনার জীবনসংগ্রাম দীর্ঘদিনের। স্বামীর একাধিক বিয়ের কারণে তিনি আলাদা থাকেন। তিন মেয়ের মধ্যে বড় দুইজন গৃহকর্মীর কাজ করে খাওয়া–পরা জোটায়, ছোট মেয়ে বাসায় থাকে। তাকে চার হাজার টাকা দিয়ে একটি পুরোনো স্মার্টফোন কিনে দিয়েছেন, যেন সময় কাটাতে পারে।
নিজের পরিবারের কথা বলতে গিয়ে হেলেনা জানান, বাবা বেঁচে নেই। মা এক বোনের সঙ্গে থাকেন। ভাইবোনেরা স্বচ্ছল হলেও কষ্টটাই তাঁর জীবনের সঙ্গী। রিকশা চালানো শিখেছেন এক লোকের কাছ থেকে, যাকে তিনি টাকা দিয়েছিলেন। সেই লোক পরে তাঁর একটি মোবাইল নিয়েই আর যোগাযোগ করেননি।
কটূক্তি বা বিরূপ মন্তব্য নিয়ে কি সমস্যায় পড়তে হয়? উত্তরে হেলেনা দৃপ্তভাবে বলেন, ‘হেরা আমার লগে কতায় পারব না।’ তাঁর রিকশায় মানুষ ওঠে কিনা প্রশ্ন করলে হাসিমুখেই জানান, ‘না ওডলে চালাই ক্যান। অনেকে তো ভাড়ার চাইয়া বেশি টাহাও দেয়।’
নিজের রিকশা থাকলে জমা দিতে হতো না, আর সেই টাকা দিয়েই মেয়ে নিয়ে ভালোভাবে চলা যেত—এই আফসোসও জানালেন হেলেনা।
লাহারহাট ঘাটে পৌঁছে ভাড়া দেওয়ার পর পরিচয় জানিয়ে তাঁর ছবি তোলা হয়। প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ভাড়া পেয়ে মুখে ফুটে ওঠে সরল হাসি। বিদায়ের আগে দূর থেকে জানতে চাওয়া হলো তাঁর নাম। উত্তর এল, “হেলেনা… ওই হেলেনা-ই।”
মলিন পোশাক, রুগ্ণ দেহ—তবু দৃঢ় মনোবল নিয়ে রিকশা চালিয়ে চলে গেলেন হেলেনা। জীবনের মতোই তাঁর নামটিও সরল, অহংকারহীন—শুধুই হেলেনা।