google-site-verification=EcdkQf27QgQiUVrz2fa6ZQxgrlewb0syaCf_Ho2k3TU
ছবির ক্যাপশন: চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড় দখল, সন্ত্রাসী বাহিনী ও প্লট বাণিজ্যে অবৈধ সাম্রাজ্য
চার দশক ধরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সলিমপুর ইউনিয়নের সরকারি পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। এখনো চলছে পাহাড় কেটে প্লট বিক্রির বাণিজ্য। এসব দখল ও বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে গড়ে তোলা হয়েছে সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী, যারা সার্বক্ষণিক পাহারা দেয় এলাকাটিতে। পরিচয়পত্র ছাড়া কোনো বহিরাগত, এমনকি পুলিশ বা প্রশাসনের সদস্যরাও সেখানে প্রবেশ করতে পারেন না।
সরকারি খাসজমি হওয়ায় এলাকাটিতে কারাগার, আইটি পার্কসহ ১১টি সরকারি প্রকল্পের পরিকল্পনা থাকলেও দখলদারদের কারণে কোনো প্রকল্পই বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। ৩ হাজার ১০০ একর জায়গা জুড়ে থাকা এই এলাকার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা।
নব্বইয়ের দশকে সন্ত্রাসী আলী আক্কাস প্রথম পাহাড় কেটে বসতি শুরু করেন। তিনি নিজস্ব বাহিনী গড়ে তোলেন এবং নিম্নআয়ের মানুষদের কাছে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে জমি বিক্রি শুরু করেন। আক্কাসের মৃত্যুর পর তাঁর সহযোগীরা—কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেক—নিজ নিজ বাহিনী গঠন করে এলাকা ভাগ করে নেয়।
বর্তমানে ইয়াসিন নেতৃত্ব দিচ্ছেন আলীনগর বহুমুখী সমিতি, আর মশিউর ও সাদেক নেতৃত্ব দিচ্ছেন মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদ-কে। দুই সংগঠনের সদস্যসংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। এসব সমিতির মাধ্যমেই চলছে অবৈধ প্লট বেচাকেনা ও চাঁদাবাজি।
গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকেই এলাকা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ ও খুনোখুনি বেড়েছে। সম্প্রতি দখল নিয়ে যুবদল নেতা রোকন উদ্দিনের অনুসারীদের সঙ্গে ইয়াসিন বাহিনীর সংঘর্ষে একজন নিহত হন। এর আগে গত ১৪ মাসে চারজন খুন হয়েছেন।
সম্প্রতি ৬০ লাখ টাকার অস্ত্র কেনার একটি অডিও রেকর্ড ফাঁস হয়, যেখানে রোকন উদ্দিনকে অস্ত্র কেনার কথা বলতে শোনা যায়। যদিও তিনি তা অস্বীকার করেছেন, তবে পুলিশ বলছে, এটি আলীনগরের দখলযুদ্ধের অংশ।
প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বারবার সেখানে হামলার শিকার হয়েছে। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের ওপর হামলায় অন্তত ২০ জন আহত হন। ২০২২ সালেও একাধিকবার র্যাব ও প্রশাসনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মুক্তাদির হাসান বলেন, “সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে যৌথ অভিযান ছাড়া পাহাড় রক্ষা সম্ভব নয়।”
স্থানীয় দালাল ও সমিতির মাধ্যমে ছোট ছোট প্লটে জমি বিক্রি চলছে ৫ থেকে ৩০ লাখ টাকায়। বিক্রেতারা দাবি করেন, “এখানে পাহাড় নেই, সব জমি।” অথচ এলাকাটির বড় অংশই কাটা সরকারি পাহাড়।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার–২, মডেল মসজিদ, নভোথিয়েটারসহ ১১টি সরকারি প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হলেও দখলকৃত জমি উদ্ধার না হওয়ায় প্রকল্পগুলো আটকে আছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাদি উর রহিম বলেন, “জঙ্গল সলিমপুরের অবৈধ বসতি উচ্ছেদে যৌথ অভিযান প্রয়োজন।”
চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম বলেন, “প্রতিবার অভিযানে গেলে হামলার শিকার হতে হয়, তাই নতুন পরিকল্পনা করা হচ্ছে।”
র্যাব-৭ এর পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, “সম্মিলিতভাবে অভিযান চালিয়ে জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসীমুক্ত করতে হবে।”
চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর এখন পাহাড়খেকো, ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসীদের দখলে এক বিপজ্জনক ঘাঁটি। প্রশাসন বলছে, সুষ্ঠু ও সমন্বিত অভিযান ছাড়া এখানকার পাহাড় ও সরকারি সম্পদ রক্ষা সম্ভব নয়।