গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর ‘ফর্ম’ বা ‘আইডিয়াজ’-এর ধারণা ছিল—প্রতিটি বস্তুরই এক নিখুঁত, চিরস্থায়ী রূপ আছে, বাস্তব জগতে যা কেবল তার অনুকরণমাত্র। ফুটবলে যদি সেই দার্শনিক ধারণা প্রয়োগ করা যায়, তবে নিখুঁত ফুটবলের প্রতীক হবে ব্রাজিলের ‘জোগো বনিতো’, অর্থাৎ সুন্দর ফুটবল।
সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিলের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স আবারও সেই ‘জোগো বনিতো’র আলোচনাকে সামনে এনেছে। ৯০ মিনিট ধরে চোখধাঁধানো ফুটবল খেলে ৫–০ গোলের জয় তুলে নেয় আনচেলত্তির দল। অনেকেই ভাবতে শুরু করেন—ব্রাজিল কি তবে ফিরে পাচ্ছে তাদের হারানো ঐতিহ্য?
তবে পরের ম্যাচেই হতাশা। জাপানের বিপক্ষে প্রথমার্ধে ২–০ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ৩–২ গোলে হেরে যায় ব্রাজিল। এই উত্থান-পতনের ভেতর থেকেই প্রশ্ন জাগে—‘আসল ব্রাজিল’ কোনটা? দক্ষিণ কোরিয়াকে বিধ্বস্ত করা দল, নাকি জাপানের কাছে হেরে যাওয়া দল?
নিখুঁত ছন্দে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে
সিউলে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকেই ব্রাজিলের খেলা ছিল মুগ্ধতা–জাগানিয়া। গতি, ছন্দ, কৌশল ও বোঝাপড়ায় পূর্ণ ছিল পুরো দল। আক্রমণ ও রক্ষণের ভারসাম্যে দেখা গেছে নিখুঁত সমন্বয়। কোচ কার্লো আনচেলত্তি ম্যাচ শেষে বলেন,
“এটা ছিল পুরোপুরি দলীয় পারফরম্যান্সের অসাধারণ প্রদর্শনী। বলের দখল থাকুক বা না থাকুক, দুই পরিস্থিতিতেই আমরা দারুণ খেলেছি।”
ভিনিসিয়ুস, রদ্রিগো, এস্তেভাও ও কাসেমিরোর ব্যক্তিগত নৈপুণ্যও ছিল অনবদ্য। বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে মনে হচ্ছিল, মাঠে কেবল ব্রাজিলই খেলছে—দক্ষিণ কোরিয়া যেন হারিয়ে গেছে।
জাপানের বিপক্ষে ভিন্ন বাস্তবতা
পরের ম্যাচে আনচেলত্তি দলে একাধিক পরিবর্তন আনেন। প্রথমার্ধে দল আগের ছন্দ ধরে রাখলেও বিরতির পর সব ছন্দ হারিয়ে যায়। রক্ষণে দুর্বলতা, পাসিংয়ে ছন্নছাড়া ভাব—সব মিলিয়ে ৩ গোল হজম করে ম্যাচ হারতে হয়। আগের ১৩৫ মিনিটের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স যেন মুহূর্তে মলিন হয়ে যায়।
এই ব্যর্থতার পরও খেলোয়াড়রা ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। মিডফিল্ডার ব্রুনো গিমারেস বলেন,
“আমরা অনেক ইতিবাচক দিক পেয়েছি, কিন্তু শেষ ৪৫ মিনিটে যে ভুল করেছি, তা আর করা যাবে না।”
শিক্ষা ও সম্ভাবনার ম্যাচ
জাপানের বিপক্ষে হারেও পাওয়া গেছে আত্মবিশ্বাস ও দলীয় সমন্বয়। নেইমারের অনুপস্থিতিতে ভিনিসিয়ুস এখন দলের নেতৃত্বের প্রতীক। রদ্রিগো, কাসেমিরো ও রাফিনিয়া নিজেদের ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ছাড়িয়ে দলীয় খেলার প্রতি মনোযোগী। আর নতুন মুখ ১৮ বছর বয়সী এস্তেভাও দ্রুতই নজর কাড়ছেন—তাকে নিয়ে আনচেলত্তির বড় পরিকল্পনা রয়েছে বিশ্বকাপকে ঘিরে।
ভবিষ্যতের পথনির্দেশ
দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের দুই বিপরীতধর্মী ফলাফলই ব্রাজিলের সামনে আয়নার মতো। একদিকে ফুটবলের নিখুঁত রূপের ঝলক, অন্যদিকে তার ভঙ্গুর বাস্তবতা।
এই দুই ম্যাচ থেকে পাওয়া শিক্ষা হয়তো ব্রাজিলকে আবারও তাদের পুরোনো গৌরবের পথে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে—যে পথে এখনো ভাসছে ‘জোগো বনিতো’র আলো।