google-site-verification=EcdkQf27QgQiUVrz2fa6ZQxgrlewb0syaCf_Ho2k3TU
ঢাকা | , ১২ মাঘ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

মাতারবাড়ীর তীরে ভাঙনের তাণ্ডব: বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছায়ায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ

Jashore Now
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 16, 2025 ইং
ছবির ক্যাপশন: মাতারবাড়ীর তীরে ভাঙনের তাণ্ডব: বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছায়ায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ ছবির ক্যাপশন: মাতারবাড়ীর তীরে ভাঙনের তাণ্ডব: বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছায়ায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ
ad728

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশেই সায়রার ডেইল গ্রামের বেড়িবাঁধ ঘেঁষে বিস্তৃত ধ্বংসস্তূপ। জোয়ারের তোড়ে ভেসে যাওয়া ঘরের ভাঙা দেয়াল, উপড়ে পড়া গাছের গুঁড়ি—সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই কিলোমিটার সৈকতজুড়ে বিধ্বস্ত জনপদের চিহ্ন। গত কয়েক বছরে সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে গেছে গ্রামের প্রায় ৬০০ বাড়িঘর।

বেড়িবাঁধে দাঁড়িয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা মো. ইউছুপ দেখালেন তাঁর ভেসে যাওয়া বাড়ির জায়গা। তিনি বলেন, “২০২৩ সাল থেকে সমুদ্র এগিয়ে আসছিল, ভেবেছিলাম আমার ঘর পর্যন্ত আসবে না। কিন্তু পরের বছরই ঢেউ ঘরের দেয়াল ছুঁয়ে ফেলল। বাধ্য হয়ে পরিবার নিয়ে পালিয়ে যাই, দুই দিনের মধ্যেই ঘরটা সমুদ্রে ভেসে যায়।”

একই অভিজ্ঞতা আবদুল মালেকেরও। তিনি বলেন, “কৈশোরে বেড়িবাঁধ থেকে সমুদ্র ছিল এক কিলোমিটার দূরে। এখন ঘর বাঁধতে হচ্ছে বাঁধের গোড়ায়। তিনবার ভেসে গেছে বসতভিটা, এবারও টিকে থাকবে কি না জানি না।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত পাঁচ বছরে প্রায় ৬০০ পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জোয়ারের তীব্রতায় জালিয়াপাড়া ও বাহারপাড়া পুরোপুরি বিলীন।


উপকূলে বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা

পরিবেশ অধিদপ্তরের উদ্যোগে বুয়েটের পানি ও বন্যাব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট (আইডব্লিউএফএম) পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে—১৯৯৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রতিবছর গড়ে ৫.৮ মিলিমিটার বেড়েছে, যা বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে অনেক বেশি।

গবেষণার নেতৃত্বদানকারী অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম জানান, “বৈশ্বিক উষ্ণতায় বরফ গলে যাচ্ছে, পানি তাপীয় সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাড়ছে। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও উপকূলীয় ঢেউয়ের তীব্রতা বাড়ছে। শতাব্দীর শেষে এ উচ্চতা ১ মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে।”

অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের পূর্ব উপকূল—চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকায় প্রতিবছর জোয়ারের উচ্চতা ৬.২৩ মিলিমিটার করে বাড়ছে। গবেষক আশরাফ দেওয়ানের মতে, “মাতারবাড়ীর বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের চাপে ভূমি দেবে যাচ্ছে, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক উষ্ণায়নজনিত সমুদ্রপৃষ্ঠের বৃদ্ধি—এ দুটি মিলে ঝুঁকি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে।”


বেড়িবাঁধও ঝুঁকিতে

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম জানান, “মাতারবাড়ী ও ধলঘাটে ৩২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আছে, এর মধ্যে ৬.৫ কিলোমিটার মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। সমুদ্রের ঢেউয়ের তীব্রতায় জিও ব্যাগ বসালেও তা বেশিদিন টেকে না।”


উন্নয়নের নামে জীবিকা হারানো

মাতারবাড়ীকে “সিঙ্গাপুরে রূপান্তর” করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০১২ সালে। একশনএইডের গবেষণায় বলা হয়, প্রকল্পের কারণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ, যাঁদের অনেকেই লবণচাষি, চিংড়িচাষি ও জেলে ছিলেন।

বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অধিগ্রহণ করা হয় প্রায় ২ হাজার ৮৮০ একর লবণমাঠ ও কুহেলিয়া নদীর অংশবিশেষ। এতে নদীপথ সংকুচিত হয়ে মাছ ধরা কমে গেছে এবং প্রতি বর্ষায় ২৩টি গ্রাম প্লাবিত হয়।

রমজান আলী নামে এক জেলে বলেন, “আগে কুহেলিয়া নদীতে মাছ ধরতাম, লবণমাঠে কাজ করতাম। এখন নদী ভরাট হয়ে গেছে, কাজ নেই। বিদ্যুৎকেন্দ্র হয়েছে, কিন্তু আমাদের জীবিকা শেষ।”

লবণচাষি জব্বার হোসেন বলেন, “বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য লবণের মাঠ গেছে, আর সমুদ্রের ভাঙনে ঘরবাড়িও হারাচ্ছি। পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি কেউ রাখেনি।”

কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাতারবাড়ী ও ধলঘাট এলাকায় ৩,৩৬৬ একর লবণমাঠ প্রকল্পে অধিগ্রহণ হয়েছে। ফলে লবণ উৎপাদন কমে যাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন হাজারো চাষি ও শ্রমিক।


“উন্নয়ন নয়, ধ্বংসের আয়োজন”

মহেশখালী জনসুরক্ষা মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মহসিন বলেন, “মাতারবাড়ীকে সিঙ্গাপুর বানানোর স্বপ্ন দেখিয়ে স্থানীয়দের জমি, পেশা ও জীবিকা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বাইরে থেকে শ্রমিক এনে কাজ দেওয়া হচ্ছে, স্থানীয়রা বেকার। উন্নয়নের নামে মানুষকে বিপন্ন করা হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “একদিকে সমুদ্রের ভাঙন, অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্পের প্রভাব—দুটো মিলে মাতারবাড়ী এখন মৃত্যুফাঁদে। সরকারের উচিত এখানকার মানুষদের টিকিয়ে রাখার জন্য জরুরি পুনর্বাসন ও অভিযোজন পরিকল্পনা নেওয়া।”


সারাংশ:
মাতারবাড়ীর বিদ্যুৎকেন্দ্রের উন্নয়ন প্রকল্প ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে একদিকে ঘরবাড়ি ভাসছে, অন্যদিকে হারিয়ে যাচ্ছে প্রজন্মের জীবিকা। সায়রার ডেইলের ভাঙা বেড়িবাঁধ আজ শুধু ধ্বংসের প্রতীক নয়—এটি জলবায়ু অন্যায়ের জীবন্ত সাক্ষী।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : Jashore Now

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ