রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় সম্প্রতি পদ্মগোখরা, রাসেলস ভাইপার, খৈয়াগোখরা ও রাজকেউটের মতো বিষধর সাপ বাড়ি, গ্যারেজ ও বহুতল ভবনে পাওয়া যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বেড়েছে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক।
সাপ উদ্ধারে রেকর্ড বৃদ্ধি
বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক আদনান আজাদ জানিয়েছেন, এ বছর এখন পর্যন্ত রাজধানীসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে ৩৫২টি সাপ উদ্ধার করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই বিষধর।
শুধু ঢাকা থেকেই গত চার মাসে ২০০টির বেশি সাপ উদ্ধার করা হয়েছে।
১ নভেম্বর রাজধানীর খিলগাঁওয়ের একটি বাসার মেঝে ভেঙে উদ্ধার করা হয় ২টি পদ্মগোখরা, ৭টি বাচ্চা ও ১৮টি ডিম। সাপের আতঙ্কে বাড়ির ভাড়াটেরা বাসা ছেড়ে চলে যান।
এর আগেও কেরানীগঞ্জ, বনশ্রী, উত্তরা ও অন্যান্য এলাকায় সাপ উদ্ধারের একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
গত বছর সংগঠনটি শতাধিক সাপ উদ্ধার করলেও, চলতি বছরেই সেই সংখ্যা তিন গুণের বেশি হয়ে গেছে।
বন অধিদপ্তরে সহায়তার আবেদন বেড়েছে
বন অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এ বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ১১৩ বার সাপ উদ্ধারে সহায়তা চাওয়া হয়েছে, যেখানে গত বছর পুরো বছরে ছিল ৮৮ বার।
তবে সাপ উদ্ধারের জন্য অধিদপ্তরের আলাদা কোনো ইউনিট বা জনবল নেই, তাই তারা বেসরকারি সংগঠনগুলোর সাহায্য নিচ্ছে।
সাপ কেন বাড়ছে শহরে
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষ জলাশয় ও খাল-বিল ভরাট করে ফেলায় সাপের প্রাকৃতিক বাসস্থান হারিয়ে যাচ্ছে।
আদনান আজাদ বলেন, বৃষ্টিতে গর্তে পানি ঢুকে পড়লে সাপ শুকনো ও উঁচু জায়গায় আশ্রয় খোঁজে—যেমন ভবনের গ্যারেজ বা বাগান।
অনেকে বাড়ির পাশে খাবারের উচ্ছিষ্ট ফেলেন, এতে ইঁদুর আসে, আর ইঁদুর খেতে আসে সাপ।
ফলে সাপ ধীরে ধীরে বাসাবাড়ির ভেতরেও ঢুকে পড়ছে।
বনশ্রী, আফতাবনগর, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, খিলগাঁও, মিরপুর, কচুক্ষেত, নিকেতন ও সাভারের বিরুলিয়া—এই এলাকাগুলোয় সাপের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ
সাপ বিশেষজ্ঞ ড. মো. আবু সাইদ বলেন, ঢাকায় সাপ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়, তবে বিষধর সাপ উদ্ধারের সংখ্যা “অতিরিক্ত বেশি মনে হচ্ছে”। তিনি বলেন, উদ্ধারকৃত সাপের প্রজাতি ও উৎস নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা জরুরি।
বন্য প্রাণী পরিদর্শক অসীম মল্লিক মনে করেন,
“মানুষ এখন সচেতন। আগে সাপ দেখলেই মারা হতো, এখন বন অধিদপ্তর বা উদ্ধারকারী সংগঠনকে খবর দেয়—তাই উদ্ধারসংখ্যা বেশি মনে হচ্ছে।”
বাংলাদেশে সাপের প্রজাতি ও বিপদসংকেত
বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ১২০ প্রজাতির সাপের তালিকা পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৩৫টি বিষধর এবং ১৬টি সামুদ্রিক সাপ।
বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪,৪৭৭ প্রজাতির সাপের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশই বিষধর।
সাপের কামড়: ভয়াবহ বাস্তবতা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০২৩ সালের জরিপ অনুযায়ী, প্রতিবছর দেশে প্রায় ৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ে আক্রান্ত হন, এবং ৭,৫১১ জন মারা যান।
এই কামড়ের ৯৫ শতাংশই গ্রামাঞ্চলে ঘটে, বিশেষ করে চরাঞ্চলে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক আবু শাহিন মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন,
“বিষধর সাপের কামড়ে তীব্র ব্যথা, ফোলা, রক্তপাত, চোখের পাতা ঝুলে পড়া ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। রাসেলস ভাইপারের কামড়ে কিডনি বিকল ও রক্তচাপ হ্রাস হতে পারে।”
সচেতনতা ও প্রতিরোধ
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ:
-
বাড়ির আশপাশ ঝোপঝাড় ও আবর্জনা পরিষ্কার রাখুন।
-
রাতে চলাচলের সময় আলো ব্যবহার করুন।
-
সাপ দেখলে মেরে না ফেলে উদ্ধারকারী সংগঠন বা বন অধিদপ্তরকে খবর দিন।
-
অ্যান্টিভেনম মজুত রাখা জরুরি, বিশেষত ঢাকা মেডিকেল ও বড় হাসপাতালগুলোতে।
-
সাপের কামড়ে অবিলম্বে হাসপাতালে যেতে হবে, কোনো ঘরোয়া চিকিৎসা নয়।
সাপের পরিবেশগত গুরুত্ব
সাপ ক্ষতিকর পোকামাকড় ও ইঁদুর খেয়ে ফসল রক্ষা করে, ফলে কৃষি উৎপাদনে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
এছাড়া সাপের বিষ থেকেই ক্যানসার, স্ট্রোক, ব্যথানাশক ও অ্যান্টিভেনম ওষুধ তৈরি হয়।
ড. আবু সাইদ বলেন,
“সাপকে ভয় নয়, বুঝতে হবে। কুসংস্কার দূর করে সাপের প্রতি সহনশীল হতে হবে। সাপে কামড়ালে আতঙ্ক নয়, চিকিৎসা নিতে হবে।”
সারসংক্ষেপে, ঢাকায় ক্রমেই বাড়ছে সাপের দেখা মেলার ঘটনা। নগরায়ন ও জলাশয় ভরাটে হারাচ্ছে সাপের আবাসস্থল, তাই তারা আশ্রয় নিচ্ছে মানুষের ঘরবাড়িতে। সচেতনতা, নিরাপত্তা ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষাই এখন একমাত্র সমাধান।