বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান বলেছেন, রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে সবকিছুই শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা মূলত বাস্তবায়নের ব্যর্থতার ইতিহাস। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যত সংস্কার প্রস্তাবই সামনে আনা হোক না কেন, যদি উদ্দেশ্য সৎ না হয়, তাহলে সেই সংস্কারের ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
আজ রোববার ঢাকায় বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন রেহমান সোবহান। তিনি ১৯৯০ সালে সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে ফেরার সময় বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদস্য হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন।
রেহমান সোবহান বলেন, সে সময় নির্বাচন কমিশনসহ কোনো ক্ষেত্রেই কাঠামোগত সংস্কার করা হয়নি। এমনকি অস্ত্রধারীদের কাছ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করাও সম্ভব হয়নি। সবকিছু নির্ভর করেছিল প্রধান উপদেষ্টা ও তাঁর উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের সৎ উদ্দেশ্য ও একাগ্রতার ওপর। তাঁর মতে, সেই সততা ও সদিচ্ছার কারণেই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন সম্ভব হয়েছিল, যেখানে বন্দী থাকা সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদও নির্বাচনে অংশ নিয়ে পাঁচটি আসনে বিজয়ী হন।
তিনি আরও জানান, সে সময়ের অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যরাও স্বাধীনভাবে নির্বাচিত ছিলেন না; তাঁদের দুই-তৃতীয়াংশ বিভিন্ন রাজনৈতিক জোটের মনোনীত ছিলেন। তবুও প্রধান উপদেষ্টার সততা পুরো প্রক্রিয়াকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল।
অনুষ্ঠানে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’ নামের একটি ওয়েবসাইট উদ্বোধন করা হয়। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সংস্কার প্রক্রিয়ার খাতভিত্তিক তথ্য, সংশ্লিষ্ট নথি ও দলিল, কোন সংস্কার কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে এবং সার্বিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করা যাবে। মতামত দেওয়া, কী-ওয়ার্ড দিয়ে অনুসন্ধান এবং সাবস্ক্রিপশনের সুবিধাও থাকবে। নাগরিক প্ল্যাটফর্ম এই উদ্যোগকে ‘সংস্কারের উইকিপিডিয়া’ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।
রেহমান সোবহান বলেন, এই রিফর্ম ট্র্যাকার নাগরিক সমাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার, যার মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে জবাবদিহির মধ্যে রাখার বিকল্প পথ তৈরি হবে। তিনি জানান, এই উদ্যোগের সময়কাল হবে আগামী পাঁচ বছর, কারণ অধিকাংশ সংস্কার বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে সম্পন্ন হওয়া সম্ভব নয়।
বর্তমান সরকারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অধ্যাদেশের মাধ্যমে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে সেগুলোকে আইনে রূপান্তর করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ ও জটিল। এই পুরো প্রক্রিয়ার ওপর নজর রাখতে নাগরিক সমাজকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শ্রম ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন এসডিজি বাস্তবায়নে গঠিত নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
আলোচনায় অংশ নেন নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার, দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ইফতেখারুজ্জামান, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদসহ বিভিন্ন কমিশনের প্রতিনিধি, নাগরিক প্ল্যাটফর্মের সদস্য এবং গবেষক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা। সম্মানিত অতিথি ছিলেন ইউএনডিপি বাংলাদেশের উপ-আবাসিক প্রতিনিধি সোনালি দয়ারত্নে এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন কমিশনার, দুদক চেয়ারম্যান ও সম্পাদক পরিষদের সভাপতি।