ঢাকা মেট্রোরেলে যাত্রীদের টিকিট পরীক্ষা থেকে শুরু করে ট্রেন চলাচল পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় ধরনের ত্রুটি ও ঘাটতি চিহ্নিত করেছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, রাজধানীর উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত নির্মিত মেট্রোরেল ব্যবস্থায় মোট ৪৫ ধরনের ত্রুটি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সংকেত ও টেলিযোগাযোগে ১০টি, বৈদ্যুতিক কাজে ১৬টি, উড়ালপথ ও অবকাঠামো নির্মাণে ১০টি এবং ট্রেন-সংক্রান্ত ৯টি ত্রুটি ও ঘাটতি রয়েছে।
ডিএমটিসিএল কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চুক্তি অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করেনি, এবং ব্যবহৃত উপকরণের মানও প্রত্যাশিত নয়। এসব ত্রুটি নিয়ে ইতিমধ্যে ঠিকাদার ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে অধিকাংশ সমস্যা এখনো সমাধান হয়নি।
চুক্তি অনুযায়ী সময় শেষ, তবুও বাড়তি সময় চাইছে ডিএমটিসিএল
চুক্তি অনুযায়ী, নির্মাণকাজ শেষের দেড় বছর পর্যন্ত যেকোনো ত্রুটি পূরণের দায়িত্ব ছিল ঠিকাদারের। সেই সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ এখন চায়, ঠিকাদার বিনা খরচে আরও দুই বছর এসব ত্রুটি সারিয়ে দিক। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠিও পাঠানো হয়েছে।
ত্রুটি-বিচ্যুতিতে চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে বারবার
চালুর পর থেকে ৩০ থেকে ৪০ বার মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছে, যা ২০ মিনিট থেকে ২২ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। ২৬ অক্টোবর ফার্মগেটে বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে একজন পথচারীর মৃত্যু ঘটার পর আবারও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ত্রুটির বিস্তারিত তালিকা
ডিএমটিসিএলের ৬৩ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, স্টেশনের ছাদ, লিফট, এসকেলেটর, কনকোর্স হল ও প্ল্যাটফর্মে পানি ঢোকার সমস্যা, ট্রেনের দরজা নির্দিষ্ট স্থানে না থামা, ইলেকট্রনিক ব্রেক বিকল হওয়া, সেন্সর ও পাওয়ার বোর্ড কার্ড ত্রুটি ইত্যাদি সমস্যা রয়ে গেছে। এছাড়া টিকিট কাটার যন্ত্র ও গেটগুলো অনেক সময় বিকল হয়, ফলে যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বিকল্প ‘এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম’ ১৫ হাজার ঘণ্টারও বেশি সময় অকেজো ছিল। ডিপোর রেললাইনে মরিচা পড়েছে, যা চুক্তি অনুযায়ী হওয়া উচিত ছিল না।
বৃষ্টির পানি ঢোকার সমস্যা ও পরামর্শকের গাফিলতি
ডিএমটিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, ১৬টি স্টেশনের ৮৯টি স্থানে বৃষ্টির পানি ঢোকার ঘটনা ঘটছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে বারবার জানালেও কার্যকর সমাধান আসেনি। কিছু জায়গায় টেপ লাগিয়ে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তা স্থায়ী নয়।
পরামর্শক ও ঠিকাদারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
মেট্রোরেলের পুরো নকশা ও নির্মাণ তদারকির দায়িত্বে থাকা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনকেডিএম অ্যাসোসিয়েশন (নিপ্পন কোই, দিল্লি মেট্রো, মট ম্যাকডোনাল্ড প্রভৃতি) প্রায় ১,০৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নিয়োগ পেয়েছিল। তাদেরই কাজ যাচাইয়ের দায়িত্ব ছিল, কিন্তু ডিএমটিসিএলের অভিযোগ—তারা দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, “মেট্রোরেল প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, কিন্তু মান নিয়ন্ত্রণে গাফিলতি হয়েছে। ঠিকাদার ও পরামর্শক উভয়কেই দায় নিতে হবে। ত্রুটিপূর্ণ স্থাপনা পেলে তার ক্ষতিপূরণ আদায় করা উচিত।”
পটভূমি ও ব্যয়
২০১২ সালে নেওয়া মেট্রোরেল প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ছিল ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা, যা পরবর্তীতে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকায়। এর মধ্যে জাইকার ঋণই প্রায় ১৯ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা। প্রতি কিলোমিটার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা—যা বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল।
উপসংহার
ত্রুটি-বিচ্যুতি ও দুর্বল মান নিয়ন্ত্রণের কারণে রাজধানীর অন্যতম ব্যয়বহুল এই মেট্রোরেল প্রকল্প এখন প্রশ্নের মুখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ ও দায় নির্ধারণ না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে এই গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন ব্যবস্থা।