তিন দফা দাবি আদায়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের দুই অংশ আজ বৃহস্পতিবার থেকে শুরু করেছেন ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ বা তালাবদ্ধ কর্মসূচি। এর ফলে টানা চতুর্থ দিনের মতো দেশের বহু বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। কোথাও শিক্ষকরা নিজেরাই বিদ্যালয়ের ফটকে তালা লাগিয়েছেন। আবার কোথাও–কোথাও পরীক্ষা হলেও তা ‘আধামাধা’ভাবে চলছে, যার ফলে উত্তরপত্র মূল্যায়ন সঠিকভাবে হবে কি না—তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এতে সারাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছে।
এ অবস্থায় আন্দোলনকারী শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনায় না বসে প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ বরং শৃঙ্খলাবিরোধী কার্যক্রমের অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে চাকরি আইন, আচরণ বিধিমালা ও ফৌজদারি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকজন শিক্ষক নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছে, যা আন্দোলনকারী শিক্ষকদের আরও ক্ষুব্ধ করেছে।
অভিভাবকদের ক্ষোভ
বার্ষিক পরীক্ষার সময় কর্মবিরতির ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা—এ অভিযোগ তুলছেন অভিভাবকেরা। অনেক বিদ্যালয়ে পরীক্ষা বন্ধ, আর কোথাও শিক্ষকবিহীন পরীক্ষার পরিস্থিতিতে শিক্ষাজীবনে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরামর্শ, দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান না হলে ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়বে।
শিক্ষকদের তিন দফা দাবি
সহকারী শিক্ষকদের প্রধান তিন দাবি হলো—
১. সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডে উন্নীত করা
২. চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড প্রদানের জটিলতা দূর করা
৩. সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি দেওয়া
বর্তমানে সহকারী শিক্ষকরা ১৩তম গ্রেডে আছেন, যার শুরুর মূল বেতন ১১ হাজার টাকা।
দেশে ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে এক কোটির বেশি। শিক্ষক সংখ্যা পৌনে চার লাখ; সহকারী শিক্ষক কর্মরত আছেন ৩ লাখ ৫২ হাজারের বেশি।
দুই সংগঠনের যৌথ শাটডাউন
‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’ ২৭ নভেম্বর থেকে কর্মবিরতি শুরু করে এবং সোমবার থেকে পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি দেয়। গতকাল বুধবার থেকে তারা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ শুরু করেছে।
একই দাবিতে ‘সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদ’ ২৩–২৭ নভেম্বর কর্মবিরতি পালন করে, এবং আজ থেকে তারাও তালাবদ্ধ কর্মসূচি শুরু করেছে। দুই পক্ষ এখন যৌথভাবে আন্দোলন চালাচ্ছে।
মাঠের চিত্র
নোয়াখালীর কৃপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গেটে আজ সকালে তালা ঝুলতে দেখা গেছে।
ঢাকার বড় মগবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখা গেছে, সহকারী শিক্ষকরা পরীক্ষা নিচ্ছেন না, তবে প্রধান শিক্ষক ও অভিভাবকদের সহায়তায় পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। কয়েকটি কক্ষে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় বসে থাকলেও সেখানে কোনো শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন না।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ: কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে কাজে ফেরার আহ্বান
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আজ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কর্মবিরতি ও পরীক্ষা বর্জন বন্ধ করে অবিলম্বে কাজে যোগদানের নির্দেশ দিয়েছে।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে—
-
১১তম গ্রেডের দাবিটি বেতন কমিশনে পাঠানো হয়েছে
-
১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেডের জটিলতা সমাধানে অর্থ বিভাগকে জানানো হয়েছে
-
সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতির বিষয়টি জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে
মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ—কিছু শিক্ষক পরীক্ষা নিতে ইচ্ছুক শিক্ষকদের বাধা দিচ্ছেন এবং কোথাও কোথাও তাঁদের ওপর হামলা হয়েছে। এটি সরকারি চাকরি আইন, আচরণ বিধিমালা ও ফৌজদারি আইন লঙ্ঘন বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষকদের আগামী নির্দেশ—অবিলম্বে কাজে যোগ দিয়ে তৃতীয় প্রান্তিকের পরীক্ষার সব কার্যক্রম যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে হবে, নতুবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।