তিন মেয়াদে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তবে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র কয়েক মাস। যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার মাধ্যমে তিনি প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেই ব্যবস্থাকে ঘিরেই ১৯৯৬ সালে রাজনৈতিক সংকটের জন্ম হয়। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা দেশজুড়ে বিরোধী আন্দোলনকে তীব্র করে তোলে। শেষ পর্যন্ত তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা মেনে নেন এবং সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনেন। এর ফলেই পরবর্তী সময়ে পরপর দুটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
ইতিহাস খালেদা জিয়াকে কীভাবে মনে রাখবে—এই প্রশ্নে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত। ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকে এক জনপ্রিয় সেনানায়কের হাতে বিএনপির জন্ম হলেও আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দলটির পুনরুত্থান ঘটান খালেদা জিয়া। একই সঙ্গে তিনি নিজেও পরিণত হন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতায়। সে সময় সংসদীয় গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে—এমন প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল।
তবে সেই প্রত্যাশা আবারও ধাক্কা খায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়োগকে ঘিরে বিতর্কে। পছন্দের ব্যক্তিকে প্রধান করার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানো হয়, যা নতুন রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। এই প্রেক্ষাপটেই ঘটে ২০০৭ সালের সেনা সমর্থিত অভ্যুত্থান, যা ‘এক-এগারো’ নামে পরিচিত। রাজনীতি চলে যায় ব্যাকফুটে। গ্রেপ্তার হন খালেদা জিয়া, হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হন তাঁর সন্তানেরা। তবু তিনি এক-এগারোর নেপথ্য শক্তির সঙ্গে কোনো সমঝোতায় যাননি—যার মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছে দীর্ঘদিন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় বিএনপি পায় মাত্র ৩০টি আসন। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করে। এরপর খালেদা জিয়া ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হন। এক-এগারোর সময়কার একটি মামলায় তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় তাঁকে কার্যত রাজনীতি ও স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণআন্দোলন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আনে। শেখ হাসিনার পতনের পর ৬ আগস্ট মুক্ত হন খালেদা জিয়া। মুক্তির পরপরই তিনি ঐক্যের ডাক দেন। ৭ আগস্ট ঢাকায় বিএনপির এক সমাবেশে ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, শান্তি, প্রগতি ও সাম্যের ভিত্তিতে আগামীর বাংলাদেশ গড়তে তরুণদের শক্তিশালী করতে হবে। ধ্বংস বা প্রতিশোধ নয়—ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ার আহ্বান জানান তিনি। লক্ষণীয় ছিল, প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিয়ে তিনি কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করেননি। এই সৌজন্যবোধ, পরিমিতিবোধ ও উদারতা রাজনীতিতে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
দীর্ঘদিন নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন খালেদা জিয়া। কারাবন্দী হওয়ার পর থেকেই তাঁর অসুস্থতা বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ব্যাধির কাছেই হার মানতে হয় তাঁকে।
বিএনপির ভেতরে নানা মত ও গোষ্ঠীর উপস্থিতি রয়েছে। দীর্ঘদিন খালেদা জিয়াই ছিলেন দলের ঐক্যের প্রতীক। তাঁর অবর্তমানে দলটির সাংগঠনিক সংহতি কতটা অটুট থাকে, সেটি বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
ইতিহাসে খালেদা জিয়া স্মরণীয় হয়ে থাকবেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে—এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনে কখনো না হারার বিরল রেকর্ডের জন্য। রাজনীতিতে আসার এক দশকের মধ্যেই রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হওয়া এবং গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় তাঁর ভূমিকা তাঁকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য অবস্থানে অধিষ্ঠিত করেছে।